সোনাদিয়া দ্বীপ: প্রদীপের নিচে অন্ধকার

Moheshkhali News pic-13-10-15এম. বশির উল্লাহ, মহেশখালী:
মহেশখালী উপজেলাটি মূল ভূখন্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলে ডিজিটালের অনেক ছোঁয়া লাগেনি এ দ্বীপাঞ্চলে। ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত দ্বীপটির অনেক স্থানে কমবেশী ডিজিটালের ছোঁয়া লাগলেও একেবারে বঞ্চিত একটি এলাকা কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ। প্রায় ১১০ বছর পূর্ব থেকে প্রায় ১০ বর্গ কি.মি. আয়তনের এ দ্বীপে জনবসতি স্থাপিত হয়ে জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে আছে এ দ্বীপে বসবাসকারী মানুষগুলো। মূল ভূখন্ডের সহিত এ দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ০৮কি.মি হওয়ায় এবং সড়ক পথে যোগাযোগের কোন মাধ্যম না থাকায় তীব্র ঝুঁকির মধ্যে প্রতিনিয়ত আতংকে দিন কাটাচ্ছে তারা। প্রতি বছর কালো বৈশাখী ঝড় সহ সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও লঘুচাপের ফলে যে কোন ধরণের ছোট বড় জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে এ দ্বীপে। যার ফলে প্রাণহানী সহ ক্ষতিগ্রস্থ হয় এ দ্বীপে বসবাসরত মানুষের অনেক সম্পদ। তাছাড়াও এ দ্বীপে বর্তমান যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পাশপাশি জাতির মেরুদন্ড শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এ দ্বীপের কোমলমতি শিশুরা। নামে মাত্র একটি বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক সংকট, শিক্ষার মান উন্নয়ন, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, উর্ধ্বতন মহলের সূ-নজর এবং সচেতনতার অভাবে নিরক্ষরতার সংখ্যাই দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এখানে। বর্তমান সরকার শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়ার মাধ্যমে অনেক সফলতা অর্জন করলেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দের অবহেলার দরুন একটা জায়গায় এখনো সফলতার ধারপ্রান্তে পৌছাতে পারেনি। আর সেটা হল অবহেলিত সোনাদিয়া দ্বীপ। সাধারণত ভোর হলেই কোমলমতি শিশুরা জ্ঞান অর্জন করার জন্য পাঠশালায় পাঠদানের জন্য যায়, যা আমাদের আশে পাশের প্রতিদিনের দৃশ্য। আর অপরদিকে ভোর হলেই সোনাদিয়া দ্বীপে বসবাসরত কোমলমতি শিশুরা বড়দের পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য মাছ ধরা, মাছ শুকানো, শামুক কুড়ানো, লাগড়ি সংগ্রহ সহ নানা ধরণের কাজ করে দিন পার করে। এভাবে জীবিকার তাগিদে সংগ্রাম করে কেটে যাচ্ছে তাদের বছরের পর বছর। আমাদের দেশে শিক্ষার হার শতভাগ করার জন্য বর্তমান সরকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সোনাদিয়া দ্বীপের কারণে বাংলাদেশে শিক্ষার হার শতভাগ করা কোন দিন সম্ভবপর হবেনা। কেননা যে বয়সে শিশুদের হাতে জ্ঞান অর্জনের জন্য বই, খাতা, কলম ইত্যাদি থাকার কথা সেই বয়সেই দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত এ দ্বীপের শিশুদের হাতে রয়েছে জীবিকা নির্বাহের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার।
অপরদিকে এ দ্বীপে বসবাসরত মানুষের কাছে শিক্ষার আলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় তাদের আচার-আচরণ সম্পূর্ণ অন্যদের তুলনায় ভিন্ন। অসচেতনতার কারণে এ দ্বীপে আধিপত্য বিস্তার সহ নানা কারণে প্রায় সময় ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকে এবং কিছু মানুষ জলদস্যূতাকে পেশা হিসেবে বেচে নিয়েছে। যারা প্রায় সময় সাগরে সাধারণ মাঝিমাল্লাদের হত্যা, অপহরণ, গুম সহ ডাকাতি করে থাকে। এমনকি বর্তমানে সোনাদিয়াকে মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসাবে অনেকে মনে করেন। কেননা এ দ্বীপের অনেক মানুষ মানব পাচারে জড়িত আছে বলে জানা যায়। অপরদিকে উপজেলা সদর থেকে এ দ্বীপে সড়ক পথে যাতায়াতের কোন মাধ্যম না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে এ দ্বীপ তার ঐতিহ্য হারিয়ে একটি সন্ত্রাসী দলের বসবাসকারী দ্বীপ হিসাবে নামকরণ হতে পারে।

অপরূপ সৌন্দর্য্যের এ দ্বীপ এবং দ্বীপে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে একটি দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গদের সূ-নজর পারবে একটি দ্বীপের মৃত্যুপ্রায় জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে। দক্ষ ও সচেতন জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারলে এ দ্বীপ হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্পট।


শেয়ার করুন