শমসের মবিনের পর এবার জোটেও শংকা

02-400x266সিটিএন ডেস্ক:
বিএনপির সব ধরনের পদ এমনকি রাজনীতি থেকে শমসের মবিন চৌধুরীর অবসরের ঘোষণায় রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। হঠাৎ করে তার এমন ঘোষণায় বিএনপিতে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। সিনিয়র অনেক নেতার প্রতি তৈরি হচ্ছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। এরপর কে?- এমন প্রশ্নও করছেন কেউ কেউ। শমসের মবিনের পদত্যাগের পর যে অবিশ্বাস আর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে সে ধাক্কা জোটেও লাগতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে নানা হিসাব কষছেন জোট নেতারা। শমসের মবিনের পদত্যাগের পর পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা। অসুস্থতার কারণেই শমসের মবিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন- বিএনপির মতো জোটের অনেক নেতাই তা মানতে নারাজ। এর পেছনে সরকারসহ বিভিন্ন মহলের চাপ রয়েছে বলে তাদের ধারণা। জোট নেতাদের শংকা, একই চাপ জোটের কয়েকটি শরিক দলেও আসতে পারে। তাদের পক্ষে সেই চাপ সামাল দেয়া অনেক কঠিনও হতে পারে। তবে নানাভাবে সৃষ্ট চাপ সাময়িকভাবে শরিকদের মধ্যে প্রভাব ফেললেও জোট ভেঙে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন না তারা।

জানতে চাইলে টেলিফোনে জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেন, ‘বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী সারা জীবন সামরিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি করেছেন। তিনি রাজনীতিতে এসেছেন খুব বেশি দিন নয়। বর্তমানে দেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তার মধ্যে অনেকের পক্ষে সুস্থভাবে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে, যারা দীর্ঘকাল থেকে রাজনীতি করেন না, তাদের পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। সুতরাং শমসের মবিনের পদত্যাগ অসুস্থতা বা চাপে হোক এটা বাংলাদেশে নতুন নয়।’ তার মতে, ‘তার (শমসের) পদত্যাগে বিএনপির কোনো ক্ষতি তো হবেই না; জোটে প্রভাব পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাজনীতি করা বা না করা শমসের মবিনের ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা আমার মনে হয় উচিত হবে না।’

জোটের একাধিক নেতা বলেন, সংখ্যার দিক থেকে ২০ দলীয় জোট হলেও কার্যত হাতে গোনা কয়েকটি রাজনৈতিক দলই মূল ভূমিকা পালন করে আসছে। জোটের কার্যক্রম ও করণীয়সহ সবকিছুই নির্ভর করছে বিএনপির মর্জির ওপর। দলটি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হলে বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা অস্থিরতা সৃষ্টি হলে জোটেও এর প্রভাব পড়ে। সর্বশেষ শমসের মবিনের হঠাৎ পদত্যাগে জোটে প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জোটের ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে কেউ কিছুই জানেন না। জোটনেত্রী খালেদা জিয়া দ্রুত দেশে ফিরে না এলে এ প্রভাব আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শমসের মবিনের পদত্যাগের পর জোটের শরিকরা এ বিষয়ে নানা মাধ্যমে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এর নেপথ্য কারণ জানার চেষ্টা করছেন। এখন পর্যন্ত তারা নিশ্চিত, এর পেছনে সরকারের নানামুখী চাপ ছিল। সামান্য চাপ থাকলেও তার এমন ঘোষণা দেয়ার কথা নয়। কারণ শমসের মবিন ছিলেন জিয়াউর রহমানের খুবই কাছের। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও তাকে পছন্দ করতেন। দলেও তিনি একেবারে অবহেলিত ছিলেন তা নয়। শমসের মবিনের মতো একই চাপ বিএনপির অন্য কোনো নেতা বা জোটের কাউকে দেয়ার কোনো চিন্তাভাবনা চলছে কিনা সে ব্যাপারে তারা পর্যবেক্ষণ করছেন।

জানতে চাইলে ২০ দলীয় জোটের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘বিএনপির নেতা শমসের মবিন রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি তো দল ছেড়ে কোথাও যাননি। হয়তো তিনি চাপেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেখেন, আমার বিরুদ্ধেও ৯টি মামলা রয়েছে। আমি নাকি বোমা মেরেছি। শমসের মবিনের মতো একজন ভালো মানুষকে রাজনীতি ছেড়ে দিতে হয়েছে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে কোনো ভালো ও শিক্ষিত মানুষ রাজনীতিতে আসবে না। যেটা রাজনীতির জন্য শুভ বার্তা নয়।’

সূত্র জানায়, নানা ইস্যুতে জোটের শরিকদের মধ্যে অনেক দিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। আর জামায়াতকে নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস তো রয়েছেই। সেই অবিশ্বাস আর সন্দেহকে কাজে লাগিয়ে সরকার ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বেশ কয়েকবার এমন গুজব ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকে জামায়াতের শীর্ষ কয়েক নেতার সঙ্গে কয়েক দফা গোপনে আলোচনা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছতে না পেরে তা ভেস্তে যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপির মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির পর স্বাভাবিকভাবে জোটে এর প্রভাব পড়বে। সেই প্রভাবকে কাজে লাগাতে পারে সরকার। এর আগেও নানামুখী চাপ ও সুবিধা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিককে জোট থেকে বের হতে বাধ্য করা হয়। যদিও কয়েকটি শরিকের ভগ্নাংশ নিয়ে এখনও ২০ দলীয় জোট টিকে রয়েছে। তাই জোটের কয়েকটি শরিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নানামুখী চাপ ও সুবিধা দেয়ার আশ্বাস দিলে শেষ পর্যন্ত তারা জোটে থাকবে কিনা এ নিয়ে নানা সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।

জোটের অন্যতম শরিক জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেন, ‘যাওয়া-আসার নাটক অতীতে অনেক দেখেছি। শমসের মবিনই প্রথম নয় যিনি দল ছেড়ে দিয়েছেন। আগে অনেকেই একই কাজ করেছেন। তাই এ নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে শমসের মবিন ভাগ্যবান যে তিনি ঘোষণা দিয়ে যেতে পেরেছেন। অতীতে অনেকে এ সুযোগটুকুও পাননি।’ তিনি বলেন, ‘তার পদত্যাগে জোটের অন্য শরিকদের মধ্যে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা জানি না তবে আমার দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।’ যত চাপই আসুক তিনি জোটে আছেন এবং থাকবেন।

লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘শমসের মবিন চৌধুরীর রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণাকে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। জোটের প্রধান শরিক বিএনপি দেশের সববৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল। আমরা মনে করি, দু-একজন চলে গেলে এ দলের যেমন কোনো ক্ষতি নেই, তেমনি জোটেও তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসা শেষে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরবেন। আশা করি, ম্যাডামের সঙ্গে শমসের মবিনের সাক্ষাৎ হলে তিনি তার অবসরের ঘোষণা থেকে সরেও আসতে পারেন।’ যুগান্তর


শেয়ার করুন