শমসের মবিনরা মেরুদন্ডহীন

mubin-400x299

ক্লাসের সবচেয়ে ভাল মেধার ছাত্রটি হয় ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। তার পরের মেধার ছাত্রটি হয় সরকারি কর্মকর্তা। আর সবচেয়ে কম মেধার ছাত্রটি হয় মন্ত্রী। এটা প্রচলিত কথা। তবে এই তিন ধরনের মেধার বাইরে সর্বোচ্চ মেধার একটি শ্রেণিও রয়েছে। তারা আসলে মেধাবী নয়, প্রতিভাবান। যাহোক এই একাডেমিক মেধার আপেক্ষিক উৎকর্ষতার কথা ভেবে চাকুিরজীবিরা নিজেদেরেকে উত্তম ভাবলেও রাজনীতিবীদরা কিন্তু তাদের চেয়ে একটুও কম উত্তম নয়। কারণ একাডেমিক মেধার প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রের বাইরে সমাজে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ রয়েছে তা রাজনীতিবিদদেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ডাক্তারের সাথে চিকিৎসা ও ওষুধ এবং প্রকৌশলীর সাথে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সমাজে একাকার হয়ে রয়েছে মানুষের সাথে তার জীবন ও সভ্যতার মতই। সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ। আসলে কৃষক থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির সমন্বয়ে এবং সব ধরনের মেধার প্রয়োগেই একটি পূর্নাঙ্গ মানব সমাজ, একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্র। মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সমাজের সকল পেশা ও শ্রেণির মানুষই স্ব স্ব ক্ষেত্রে মানানসই, প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ’বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ প্রবাদের মত এটাও বলা যায় যে চাকুরিজীবিরা চাকরিতে এবং রাজনীতিবিদরা রাজনীতিতে সুন্দর।
সমস্যা হয় চাকুিরজীবিরা যখন রাজনীতিতে চলে আসেন। কেউ চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসতেই পারেন তার জন্য সেটা বেশি মানানসই, উপযুক্ত ও আদর্শিক হলে। কিন্তু কেউ যখন সারা জীবন কিংবা দীর্ঘদিন চাকরি করে আপেক্ষিক বেশি কিছু পাওয়ার আশায় রাজনীতিতে আসেন তখনই সৃষ্টি হয় বিভিন্ন রকম বিপত্তি ও অঘটন। কারণ সারাজীবন চাকরি করার কারণে বিশেষ ধরনের ’টাইপড’ হয়ে ত্যাগ-তীতিক্ষাবিহীন ও শুধুমাত্র আহরণকেন্দ্রিক ও প্রাপ্তিমূলক যে মানসিকতা গড়ে ওঠে সেই মানসিকতা থেকে তারা বের হতে পারেন না। জেল জুলুম জাতীয় ত্যাগ স্বীকারেরতো প্রশ্নই আসে না। আর তাই এ পর্যন্ত চাকুরিজীবি যারা রাজনীতিতে এসেছেন তারা হয় সরকারি দলে অথবা সম্ভাব্য সরকারি দলে যোগ দিয়েছেন। চাকুিরজীবনের ভোগ বিলাস ও অধিক ক্ষমতার একটা ’এক্সটেন্ডেড লাইফ’ হিসেবেই তারা চাকরি জীবনের শেষে রাজনীতিতে যোগ দেন। কোনো আদর্শের কারণে নয়। এ কারণেই এ জাতীয় অধিকাংশ রাজনীতিবিদদের মধ্যে ভীরুতা, কাপুরুষতা ও প্রতিশ্রুতিহীনতা প্রকটভাবে বিদ্যমান থাকে। মেরুদন্ডতো কখনোই থাকে না। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও ইয়াজউদ্দীন আহমেদ একই পরিস্থিতিতে কে কেমন মেরুদন্ড প্রদর্শন করেছিলেন তা থেকে রাজনীতির ও রাজনীতির বাইরের মানুষদের রাজনৈতিক মেরুদন্ডের পার্থক্য বোঝা যায়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী সম্প্রতি শারীরিক অসুস্থতাজনিত অক্ষমতার কারণে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। বয়স ও নানাবিধ রোগব্যাধির কারণে শারীরিক অক্ষমতা একটি স্বাভাবিক প্রকৃতিগত বিষয়। কিন্তু তার জন্য ঘটা করে সাংবাদিকদের সাক্ষী রেখে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে হবে কেন? তার অক্ষম শরীরকে বিএনপিতো টেনে হিচড়ে মিটিং মিছিল কিংবা সমাবেশে নিয়ে যেত না। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বিএনপিতো তাকে কোনো দায়িত্ব¡ও দিত না। আসলে তিনি পদত্যাগ নয় পদত্যাগের ঘোষণাটাই খুব বড় করে দেখাতে চেয়েছেন কারণ তিনি আর বিএনপিতে নেই এই ঘোষণাটা এখন তার জন্য খুব জরুরি। এ ঘোষণাটি দেওয়ার ফলে তিনি এখন বিএনপির এই দুঃসময়ের সকল হ্যাজার্ড থেকে মুক্ত থাকবেন। সারাজীবনের সরকারি চাকুরি জীবনের মত সরকারের কৃপায় ও সুনজরে থেকে এখন থেকে মামলামোকাদ্দমামুক্ত হয়ে বেশ আরাম আয়েশেই দিন যাপন করতে পারবেন কারণ তার এ পদত্যাগের ফলে বিএনপি এখন কিছুটা হলেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে যা বর্তমানে সরকারের জন্য খুবই সুখকর। সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক সময় তাকে বেঈমান বললেও এখন খুব সঙ্গতকারণেই তিনি প্রতিদানবঞ্চিত হবেন না। আসলে প্রকৃত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব না হওয়ার কারণে ধৈর্য ধরে রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা মোকাবেলা করার মত শক্ত মুমিন তিনি হতে পারেন নি। তাই সবার আগেই চাপে চ্যাপ্টা হওয়ার প্রদর্শনীটা অতি দ্রুত করে ফেললেন সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ক্যামেরার সামনে।
শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগের ব্যাপারে কোনো কোনো পত্রিকা দলের হাই কমান্ডের সাথে তার মান অভিমানের কথাও লিখেছে। মান-অভিমান ও যোগ্যতা অনুযায়ী পদ-পদবী না পাওয়া একটা বড় দলে থাকতেই পারে। এ বিষয়গুলো কারো জন্য চিরস্থায়ীও নয়। কোনো বড় দলই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উর্ধে নয়। কিন্তু দলের ভেতরের দলাদলির কারণেতো রাজনৈতিক আদর্শের কেউ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না যা দলের বিপক্ষে যায়। ছোট্ট একটি প্রশ্নতো এসেই যায় যে বিএনপি এখন সরকারে কিংবা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে তিনি কি এভাবে পদত্যাগ করতেন? তিনি নিজে যেহেতু তার মান অভিমানের কথা বলেননি তাই তাকে এ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক নয়। কিন্ত শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত এ কারণে যে তিনি এ পদত্যাগটি না করলেও পারতেন কারণ মানব শরীরের রোগের সাথে তার পদ কিংবা পদত্যাগ কোনোভাবেই সম্পর্কযুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে তার এই পদত্যাগটি ব্যক্তিগত নয়, ব্যক্তিস্বার্থগত। তাই ব্যক্তিস্বার্থে তিনি দলের বিপদের সময়ে দল থেকে পদত্যাগ করে নিজে বিপদমুক্ত থাকতে চেয়েছেন দলের বিপদ কিছুটা বাড়ানোর মাধ্যমে হলেও। দলের প্রতি আনুগত্য ও আদর্শের প্রতি প্রতিশ্রুতি না থাকলে তবেই এমনটি সম্ভব। আর এমন মানসিকতায় দলের দুর্দিনে নিজের সমস্ত ব্যক্তিস্বার্থ বাদ দিয়ে দলের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে থাকার মত সাহস ও মেরুদন্ডতো অসম্ভব।
কোনো কারণে স্কুল ফাঁকি দেওয়ার প্রয়োজন হলে বাচ্চারা পেটে ব্যথা ও মাথা ব্যথা এ দুটো অজুহাত দেখায়। কারণ এ দুটো প্রমাণ করা যায় না। বড়রা প্রয়োজন হলে অজুহাত হিসেবে শারীরিক অসুস্থতাকে সামনে আনে। বাচ্চারা অবুঝ ও দায় দায়িত্বহীন। তারা যে কোনো কিছুই করতে পারে। কিন্তু দায়িত্ববান বয়স্ক লোকেরা যখন শারীরিক অসুস্থাকে পুঁজি করে অন্যকে বিপদে ফেলে নিজে উপকৃত হতে চায় তখন তা অনৈতিক। একজন মানুষের শারীরিক অসুস্থতার প্রতি সহানুভুতি প্রতিটি বিবেকসম্পন্ন মানুষেরই থাকবে। কিন্তু কোনো মানুষ যখন সেই অসুস্থতাকে অসুস্থভাবে ব্যবহার করে কিংবা তা থেকে বেনিফিশিয়ারি হতে চায় তখন তা তার অক্ষম মেরুদন্ডের ব্যক্তিত্বহীন কিছু চাওয়া পাওয়া ও যোগ বিয়োগের অনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছাড়া কিছু নয়।


শেয়ার করুন