মূল নকশা অনুযায়ী কাজ না করা-ই বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের কারন

IMG_20160522_120651বিশেষ প্রতিবেদক : ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে ষাঠের দশকে ণির্মিত কক্সবাজরের সি ডাইক ও ইন্টারিউর ডাইক বেড়িবাঁধ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস, জোয়ারের পানিসহ বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দূর্যোগে ভাংছে জেলার বাঁধগুলো। দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসইভাবে নির্মণ না করে শুধুমাত্র মাটি দিয়ে তৈরী ও শুষ্ক মৌসুমে নকশা অনুযায়ী কাজ না করায় প্রতি দূর্যোগে বাঁধ ভাঙ্গনের প্রধান কারন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সমুদ্র উপকূলজুড়ে মেনগ্রোফ ফরেষ্ট উজাড় হওয়াকেও বাঁধ ভাঙ্গার কারন বলে মনে করছেন অনেকে।
কক্সবাজারে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শক্তিশালি ঘূর্ণিঝড় রোনুর আঘাতে বিলীন হয়ে গেছে ৭টি উপজেলার ৬৭.৮৪১ কিঃমিঃ বেড়িবাঁধ। ঝুকিঁপুর্ণ হয়ে পড়েছে জেলার বিভিন্ন উপজেলার উপকূলীয় অন্যান্য বেড়িবাঁধগুলো। পাশাপাশি উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধের বিলীন হওয়া অংশগুলো দিয়ে প্রতিনিয়ত জোয়ারের পানি ঢোকায় দিন দিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে জেলার মোট ৫৯৬ কিঃমিঃ বেড়িবাঁধের মধ্যে ভেঙ্গে যাওয়া বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ সাড়ে প্রায় ৬৮ কিঃমিঃ অংশের মেরামতের জন্য ৭৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা প্রয়োজন হবে বলে কক্সবাজার পাউবো সূত্রে জানা গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ জেলার বেড়ি বাঁধগুলো পুঃন নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য প্রয়োজন হবে ৫০০ কোটি টাকা। অথচ পাউবো কর্তৃপক্ষ মনগড়া একটি হিসাব কসে মাত্র ৭৫ কোটি টাকার বাজেট করে তা মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলার সব জায়গাতেই বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষের উচিৎ ছিল সময় নিয়ে প্রকৃত বাজেট পেশ করা এতো তাড়াহুড়ো করে তাদের বাজেট করার উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ।
জানা গেছে, কক্সবাজারের বেড়িবাঁধগুলো শুধুমাত্র মাটির তৈরী। তবে টেকনাফসহ কিছু ঝুকিপুর্ণ অংশে মাত্র ৮ থেকে ১০ কিঃমিঃ সিসি ব্লক বা প্রতিরক্ষা মূলক বাঁধ রয়েছে। তবে জেলার উপকূলীয় এলাকার সকল বিড়িবাঁধগুলো যদি সিসি ব্লক পদ্ধতিতে নির্মাণ করা যায় তাহলে বাঁধ ভাঙ্গার সম্ভবনা অনেক কমে আসবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন করে সিসি ব্লক পদ্ধতিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব না। এর ফলে উপকূলীয় এলাকাগুলো সেই ঝুকিঁর মধ্যেই রয়ে গেলো। তাছাড়া অনেক সময় শুষ্ক মৌসুমে বেড়িবাঁধের নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় প্রতি বছর বন্যা বা অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে বিলীন হচ্ছে কোন না কোন স্থানের বাঁধ।
পাউবো সূত্রে আরো জানা গেছে, জেলার ২২টি পোল্ডারে এবারের ঘূর্ণিঝড়ে বেড়িবাঁধগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পেকুয়ার ৬৪/২বি নং পোল্ডারের ১৪.৪২৬ কিঃমিঃ, ৬৪/২এ নং পোল্ডারের ২.৭৫০ কিঃমিঃ, কুতুবদিয়ার ৭১ নং পোল্ডারের ৯.৪০০ কিঃমিঃ, মহেশখালীর ৭০ নং পোল্ডারের ১১.৯২০ কিঃমিঃ, ৬৯ নং পোল্ডারের ২ কিঃমিঃ ৬৯ (পি-১) ০.৭০০ কিঃমিঃ, ৬৯ (ন-ই) ১.৫০০ কিঃমিঃ, চকরিয়ার ৬৫ নং পোল্ডারের ২ কিঃমিঃ, ৬৫/এ নং পোল্ডারের ২.৫০০ কিঃমিঃ, ৬৫/এ-১ নং পোল্ডারের ২.২২৫ কিঃমিঃ, ৬৫/এ-৩ নং পোল্ডারের ১.৯৭০ কিঃমিঃ, ৬৬/৪ নং পোল্ডারের ২.১৫০ কিঃমিঃ, সদরের ৬৬/১ নং পোল্ডারের ১.৮০০ কিঃমিঃ, ৬৬/২ নং পোল্ডারের ২ কিঃমিঃ, ৬৬/৩ নং পোল্ডারের ৩.২০০ কিঃমিঃ, টেকনাফের ৬৭ নং পোল্ডারের ১কিঃমিঃ, ৬৭/এ নং পোল্ডারের ২কিঃমিঃ, ৬৭/বি নং পোল্ডারের ০.৬০০ কিঃমিঃ, ৬৮ নং পোল্ডারের ১.২০০ কিঃমিঃ এবং উখিয়ার ৬৭/এ পোল্ডারের ১.১০০ কিঃমিঃ অংশগুলো এবারের ঘূর্ণিঝড়ে বিলীন হয়েছে।
কক্সবাজার পাউবো এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সবিবুর রহমান জানান, কক্সবাজার জেলায় এবারের ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে জেলায় ৬৭.৮৪১ কিঃমিঃ বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এসব বাঁধগুলো পরির্দশ করে আমরা একটি প্রতিবেদন এবং এসব বাঁধ সংস্কারের প্রয়োজনীয় টাকার হিসাব ইতোমধ্যে ঢাকা পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করবো। তিনি আরো বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরনের উপায় হচ্ছে জরুরী ভিত্তিতে কাজ শুরু করা। আর শুষ্ক মৌসুমে নকশা অনুযায়ী কাজ করলে আগামীতে বেড়িবাঁধ ভাঙ্গন অনেকাংশে কমে আসবে।
কক্সবাজারের প্রায় সাড়ে ২৩ লক্ষ মানুষকে ঘিরে রেখেছে বিশাল বঙ্গোপসাগর, নাফ-নদী, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি। এ পানি কক্সবাজারের মানুষের জন্য আশীর্বাদের পাশাপাশি অভিশাপও। আর এ অভিশাপ থেকে রক্ষার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের সাগর ও নদীর পাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে বেড়িবাঁধ। কিন্তু সেই বেড়িবাঁধের এখন বেহল দশা। জেলার উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ প্রায় সবস্থানে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। বিশাল সাগর আর নদীর পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে পানিতে সয়লাব হয়েছে কক্সবাজারের ৮ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। এখনো পানির সাথে যুদ্ধ করছে কুতুবদিয়া, টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া কক্সবাজার সদর এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার পরিবার। এখানকার মানুষের জীবন চলছে জোয়ার ভাটার দোলাচলে। এবারের বাঁধ ভাঙ্গনে লোনা জলে বিনষ্ট হয়েছে শত শত চিংড়ি ঘেড়, গাছ-পালা ফসলি জমি, পনির নিচে তলিয়ে গেছে হাজরো বসত বড়ি, পানিতে সয়লাব হয়েছে স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষয়ক্ষতি কটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যাবে বলে জনিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। তই আগামীতে প্রাকৃতিক দূর্যোগে বেড়িবাঁধগুলো যেন ভাঙ্গনের কবলে না পড়ে তাই সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জনিয়েছেন জেলার সর্বোস্তরের জনসধারণ।


শেয়ার করুন