মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনালঃ তরল গ্যাসে গরল হিসাব

সমকালঃ
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মোহরাকাটার বাসিন্দা শরিফা বেগম। প্রতিদিনের মতো গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরেও মাথায় একবোঝা লাকড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন ৫২ বছর বয়সী এই নারী। এই লাকড়ি দিয়ে চলবে ভাত-তরকারি রান্না। আবহমানকাল ধরে এভাবেই চলছে মোহরাকাটার সাগরপাড়ের নারীদের জীবন। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে হঠাৎ একদিন তাতে নতুন আশার ঢেউ আছড়ে পড়ে- তাদের আঙিনায় চলে আসছে গ্যাস। রান্না সারা যাবে গ্যাসের চুলায়। বাড়ির কাছেই সাগরে বসানো হচ্ছে ‘ভাসমান এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল’।

এটাই দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। ২০১৭ সালে প্রকল্প শুরু হয়, তখন দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল ৩৫০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু উৎপাদন হতো ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি পূরণে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেয় এই টার্মিনাল নির্মাণের। বিদেশ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস তরল আকারে কিনে জাহাজে করে এনে টার্মিনালে ঢালা হবে; সেখানে তরলটাকে ফের গ্যাস বানিয়ে জাতীয় গ্রিডে নিয়ে কলকারখানা-বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হবে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে বিনা টেন্ডারেই দায়িত্ব দেওয়া হয় বিদেশি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘এক্সিলারেট এনার্জি’কে। চুক্তি হয় এ রকম- সব খরচ বহন করে তারাই টার্মিনালটি বানিয়ে যন্ত্রপাতি বসিয়ে দেবে; আর সরকার জনগণের টাকায় বিদেশ থেকে এলএনজি কিনবে, জাহাজ ভাড়া করে দেশে আনবে, তারপর ভাসমান টার্মিনালে পৌঁছে দেবে এবং সেখানে গ্যাসে রূপান্তর হলে জাতীয় গ্রিডে নিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের ভেতরে সরবরাহ করবে। আর এক্সিলারেট এনার্জি তাদের কাজটুকুর জন্য মাসে মাসে নির্দিষ্ট হারে মাশুল পাবে। সঙ্গে তারা পাবে ভ্যাট-ট্যাক্স-আয়করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও ছাড়। তবে সমকালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই ভাসমান টার্মিনালের ‘ডুবে ডুবে জল খাওয়া’র এক চেপে রাখা কাহিনি। টার্মিনালের কর্তারা ওখানে গ্যাসের আড়ালে আয়োজন করেছেন দেশের অর্থ লুট করে বিদেশে পাচারের এক জটিল-যজ্ঞ। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন প্রকল্পে দেশের স্বার্থবিরোধী অন্তত দুটি কারসাজি স্পষ্ট ধরা পড়েছে অনুসন্ধানে। এক. টার্মিনালের যন্ত্রপাতি আমদানির নামে অর্থ পাচার। দুই কোটি ৬৫ লাখ ডলারের মালপত্র কেনার এলসি করা হলেও এসেছে এক কোটি ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ডলারের; বাকি এক কোটি ১৯ লাখ ডলার বা ১০৩ কোটি টাকার হদিস মেলেনি। দুই. বিদেশি কোম্পানিটির বিনিয়োগ আনা হয়েছে শেয়ারহোল্ডার ঋণ হিসেবে নজিরবিহীন উচ্চহারের সুদে।

এই বৈদেশিক ঋণের সুদহার ১৮ শতাংশ, যা বাংলাদেশে তো নয়ই, বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, এত চড়া সুদের হার দেখিয়ে কেউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে বসে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করছে। পাশাপাশি দেশ থেকে দৃশ্যত বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য শুরু থেকেই এমন সব চোরাগলি পথে হাঁটা হয়েছে, যাতে নেপথ্যের হোতারা থেকে যায় অন্ধকারে এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে।
শরিফা বেগমরা এত সব জটিল হিসাব-নিকাশ বোঝেন না। তারা শুধু সরল মনে বুঝেছিলেন, বাপদাদা, স্বামী-শ্বশুরের ভিটামাটি, জমিজমা আর লবণ ব্যবসা ধরে রাখা না গেলেও প্রতিদিন অন্তত গ্যাসের চুলায় রেঁধেবেড়ে খেতে পারবেন।

সেই সুখ কি তাদের মিলেছে? মোহরাকাটার যে জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি মনে এলো, সেখানে বসানো হয়েছে ‘কাস্টডি ট্রান্সফার মিটারিং স্টেশন’। এর ঠিক উল্টো পাশেই শরিফা বেগমের বাড়ি। তার পাশে রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানে বসা নুরুল ইসলাম, আবদুল হালিম। তাদের কাছ থেকে জানা গেল, কোথায় সুখ? রাস্তার ওপাশের লবণ চাষের জমিজমা, বাড়িঘর সব অধিগ্রহণ হয়ে গেছে; অনেকে ঠিকমতো ক্ষতিপূরণও পায়নি। এখন তাই এলাকার পুরুষেরা চায়ের দোকানে বসে অতীতের স্মৃতিচারণ করেন; বাপদাদার ভিটা-সম্বল রক্ষার আন্দোলন-সংগ্রাম, পরে ‘জাতীয় গুরুত্বের’ কাছে নতি স্বীকার এবং শেষমেশ বাড়িতে গ্যাস পাওয়ার আশ্বাসটুকুও নিভে যাওয়ার ঘটনাগুলো আলোচনা করেন। নারীরা আগের মতোই লাকড়ির চুলোর রান্নাবাড়া করেন আর ধোঁয়ায় জ্বলা চোখে তাকিয়ে থাকেন মিটারিং স্টেশনের দিকে।

চাতুরীপনায় জন্ম: অগ্রাধিকার ও জাতীয় গুরুত্বের দোহাই দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি এলএনজি টার্মিনালের কাজ দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ‘এক্সিলারেট এনার্জি’কে। এদের বিনিয়োগটাও সোজাসুজি আসেনি, এসেছে ঘুরপথে। বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডে (বিডা) সংরক্ষিত তথ্য বিশ্নেষণে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যে মূল মালিকপক্ষের নামধাম গোপন করে বিতর্কিত উপায়ে নিবন্ধিত দুটি কোম্পানির নামে বিনিয়োগ এনে বাংলাদেশে ‘এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড (ইইবিএল)’ গঠন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত দুটি কোম্পানি হলো ‘এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ, এলএলসি’ এবং ‘এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ হোল্ডিংস, এলএলসি’।

যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত কোম্পানির অনলাইনে তথ্যসেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ওপেন করপোরেটস থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম কোম্পানিটি খোলা হয় ২০১৪ সালের ২৫ জুন। আর দ্বিতীয়টি খোলা হয় ২০১৫ সালের ৮ জুন। ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যেরই ‘দ্য করপোরেশন ট্রাস্ট’ কোম্পানিকে এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে ওই দুই কোম্পানির নিবন্ধন নেওয়া হয় সেখানকার ডেলাওয়ার ডিভিশন অব করপোরেশন থেকে। কোম্পানি দুটিরই ঠিকানা দেওয়া হয়েছে করপোরেশন ট্রাস্ট কোম্পানির ঠিকানায়, যার অবস্থান ১২০৯, অরেঞ্জ স্ট্রিট, উইলমিংটন, নিউ ক্যাসল করপোরেশন ট্রাস্ট সেন্টার। মালিকানার তথ্য গোপন রেখে কোম্পানি গঠন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই ট্রাস্ট কোম্পানির ‘খ্যাতি’ আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের বিতর্কিত এই বিনিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিলে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এটির শিরোনাম ছিল “ট্রাম্প অ্যান্ড ক্লিনটন শেয়ার ডেলাওয়ার ট্যাক্স ‘লুপহোল’ অ্যাড্রেস ইউথ ২৮৫,০০০ ফার্মস”। প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্য করপোরেশন ট্রাস্ট কোম্পানি, ১২০৯ অরেঞ্জ স্ট্রিট, উইলমিংটন, নিউ ক্যাসল- এই ঠিকানা ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুই লাখ ৮৫ হাজার কোম্পানির নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। দ্বিতল এই ভবনটি কর ফাঁকির স্বর্গরাজ্য।
ধমক দিয়েই যাত্রা শুরু!: সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, মহেশখালী উপকূলের অদূরে গভীর সমুদ্রে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের ক্ষমতাসম্পন্ন ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি স্থাপনের জন্য ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ‘বাস্তবায়ন চুক্তি’ সই করে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড-ইইবিএলের সঙ্গে। একই দিন পেট্রোবাংলার সঙ্গে টার্মিনাল ব্যবহার চুক্তি হয় তাদের। পরের বছর অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ফ্রান্সভিত্তিক ‘জিওসান’ কোম্পানির সঙ্গে তিনটি চুক্তি করে ইইবিএল। ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ, ২৬ মে ও ১৪ জুলাই ওই তিনটি চুক্তি সই হয়। চুক্তির আলোকে টার্মিনালের ‘স্থায়ী অবকাঠামো-সংশ্নিষ্ট পণ্য’ আমদানির জন্য ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে জিওসানকে কয়েক দফায় অগ্রিম দুই কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার ৯৫০ ডলার পাঠায় ইইবিএল। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নেওয়ার প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে অনীহা দেখায় কোম্পানিটি। ফলে অনাপত্তি দিতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

তারপরও অনাপত্তি কীভাবে পেল তারা- অনুসন্ধানের একপর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, টার্মিনালটি সরকারের একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প, এই যুক্তি তুলে অনাপত্তি দেওয়ার জন্য কয়েক দফায় টেলিফোন করে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি কড়া ভাষায় নির্দেশ দেন। পরে আর নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে না পেরে শর্তসাপেক্ষে অনাপত্তি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সূত্রটি সেই প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও বলেন। তবে নামটি গোপন রাখার অনুরোধ করায় প্রতিবেদনে সেটি উহ্য রাখা হলো।
অর্থ পাচারের শঙ্কা: বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিপত্রে শর্ত হিসেবে বলা আছে, অর্থ পাঠানোর ১২০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থের কাস্টমস সার্টিফায়েড বিল অব এন্ট্রি জমা দিতে হবে। কোনো কারণে পণ্য আনতে না পারলে অর্থ ফেরত এনে রিপোর্ট করার বিধান মানতে হবে। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইইবিএল সেসব শর্ত পরিপালন করেনি। শেষে গত ৭ ডিসেম্বর কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- জানতে চেয়ে শোকজ নোটিশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নোটিশে বলা হয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী অবকাঠামো-সংশ্নিষ্ট পণ্য আমদানির জন্য দুই কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার ৯৫০ ডলার পাঠানোর অনাপত্তি দেওয়া হয়। এক্সিলারেট এনার্জি এক কোটি ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ৪৬৫ ডলারের বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেছে। অর্থ পাঠানোর ৪০ মাস পার হলেও অদ্যাবধি অবশিষ্ট এক কোটি ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৪৮৫ ডলারের বিল অব এন্ট্রি দেয়নি। এ বিষয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও পণ্য আনার প্রমাণ দাখিল করা হয়নি, যা ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্টের ৪(৩) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ২৩(১) ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ওই আইনের ৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা যে উদ্দেশ্যে অনুমতি নেওয়া হয়েছে, তার বাইরে অন্য কাজে খরচ করা যাবে না। কোনো কারণে নির্দিষ্ট কাজে খরচ করতে না পারলে তা ব্যাংকের মাধ্যমে ফেরত আনতে হবে। আর আইন লঙ্ঘনের দায়ে ২৩(১) ধারায় সাত বছরের জেল ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটিশের জবাব দিতে প্রথমে গত ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। পরে ইইবিএলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ জানুয়ারি, ২০২২ পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। শেষে গত ২০ ও ৩০ জানুয়ারি দুই দফা চিঠিতে জবাব দেয় তারা। প্রথম চিঠিতে জবাব এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয় চিঠিতে এক্সিলারেট এনার্জির কান্ট্রি ম্যানেজার হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার স্বাক্ষরে বলা হয়, জিওসানকে অগ্রিম অর্থ পাঠানো হয়েছিল ‘মাইলস্টোন পেমেন্ট (লাম্পসাম)’ হিসেবে। এ উপায়ে পাঠানো অর্থে পণ্য, সেবা বা পণ্য ও সেবা- উভয় ক্ষেত্রে মূল্য পরিশোধ করা যায়। ফলে এক কোটি ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ৪৬৫ ডলারের পণ্য আমদানির বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়েছে। বাকি অংশ বিদেশে খরচ হয়েছে যন্ত্রপাতি সংযোজন, পরামর্শ ফিসহ সেবা খাতে। চার বছর পর এসে এক্সিলারেট এনার্জির বিদেশি নিরীক্ষক ও আইনজীবীর পক্ষ থেকে এর সপক্ষে পত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয় গত ১ মার্চ। দু’দিনের মাথায় ৩ মার্চ তিনি সমকালকে বলেন, এক্সিলারেট এনার্জি তাদের বক্তব্যের পক্ষে কিছু তথ্য দিয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হবে কিনা, তা পর্যালোচনাধীন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সমকালকে বলেন, সেবা খাতে খরচের জন্য আলাদাভাবে অর্থ পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করা কোম্পানির এটি জানার কথা। তারা পণ্য কেনার জন্য যে প্রক্রিয়ায় অনুমতি নিয়েছে, একইভাবে সেবা খাতের জন্য অর্থ পাঠানোর অনুমতি নিতে পারত। সেটা তারা করেনি। তাই ওই অর্থ সেবা খাতে খরচ করার দাবি অবিশ্বাস্য। এ ছাড়া কোনো কারণে এমনটি ঘটলেও এত দিন অবশ্যই তারা এর সপক্ষে কাগজপত্র দিত। তা না করে চার বছর বসে থাকত না। এই অর্থ পাচার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
নজিরবিহীন সুদ: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (বিডা) জমা দেওয়া নথি থেকে জানা যায়, ইইবিএলের বিনিয়োগের পুরোটাই এসেছে ঋণ হিসেবে। এর মধ্যে শেয়ারহোল্ডার ঋণের নামে ১৮ শতাংশ সুদে আনা হয়েছে চার কোটি ৮৯ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৮ ডলার। এই ঋণ সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ডেলাওয়ারে নিবন্ধিত এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ, এলএলসি এবং এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ হোল্ডিংস, এলএলসি। বিশ্বের কোথাও এত উচ্চ সুদে বৈদেশিক ঋণ আনার নজির নেই। অথচ বিদেশি একটি কোম্পানিকে এই সুযোগ করে দিয়েছে বিডা।

বিডার কাছ থেকেই জানা গেল, বাংলাদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশি ঋণ নিলে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদ লাগে। সরকারি বিদেশি ঋণের বেলায় এই সুদ আরও কম। কিন্তু এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পে ১৮ শতাংশ সুদে শেয়ারহোল্ডার ঋণ আনায় যে কেবল বিস্ময় আর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে, তাই নয়; এভাবে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে অনেক বেশি। বছরে এই ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হচ্ছে ৮৮ লাখ ১৩ হাজার ২৪৬ ডলার বা প্রায় ৭৬ কোটি টাকা।

ভাসমান টার্মিনাল একটি বিওওটি (বিল্ড ওন অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার) প্রকল্প। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যয়, পরিচালন ব্যয় ও মুনাফা হিসাব করে মাশুল ধরা হয়। সেই হিসাবে সরকার প্রতিবছর গড়ে ৯ কোটি ডলার (৭৭৪ কোটি টাকা) মাশুল বা টার্মিনাল ভাড়া দিচ্ছে এক্সিলারেট এনার্জিকে। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ বছর পর ২০৩২ সালে টার্মিনালটি চলে আসবে পেট্রোবাংলার মালিকানায়। ওই সময় পর্যন্ত এক্সিলারেট এনার্জির বিনিয়োগ করার কথা সর্বমোট ৫০ কোটি ডলার। আর ১৫ বছরে তারা নিয়ে যাবে অন্তত ১৩৫ কোটি ডলার বা ১১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।

এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশের আলাদা কোনো ওয়েবসাইট নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট ফরম পূরণের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য জানা ও প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে মিডিয়া ‘রিলেশন বিভাগে’ এ প্রতিবেদকের নাম, ফোন ও ই-মেইল অ্যাড্রেস দিয়ে গত ৩ এপ্রিল যোগাযোগ করা হয়। তাদের কাছে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশের পুরো মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির কিনা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ১৮ শতাংশ সুদে শেয়ারহোল্ডার ঋণ এবং ‘স্থায়ী অবকাঠামো-সংশ্নিষ্ট পণ্য’ আমদানির জন্য পাঠানো অর্থের আংশিক ফেরত না আনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্ন পাঠানোর এক সপ্তাহ পরও এর কোনো উত্তর মেলেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে এক্সিলারেট এনার্জির কান্ট্রি ম্যানেজার হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া গতকাল টেলিফোনে প্রথমে সমকালকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এ রকম বিষয়ে আমি অবহিত না।’ আপনি অবহিত না- এ রকম প্রশ্ন করার পর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের রুটিন কাজকর্ম হয়। সব সমাধান ইস্যু। পেন্ডিং কিছু নেই।’

বিদেশি ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত বিডার একজন কর্মকর্তা গত ৩ এপ্রিল সমকালকে বলেন, সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক খাতের জন্য ২ থেকে ৩ শতাংশের বেশি সুদে বিদেশি ঋণ অনুমোদন করা হয় না। কিছু ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ আনার অনাপত্তি দেওয়া হয়। কিন্তু ভাসমান টার্মিনাল প্রকল্পটি দেশের প্রেক্ষাপটে একেবারে নতুন ছিল। তা ছাড়া তাদের টাকা তারাই নিয়ে যাবে- এসব কারণে ১৮ শতাংশ সুদ নিয়ে তখন আপত্তি তোলা হয়নি।

কর্মকর্তার যুক্তি শুনে তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো, তাদের টাকাই শুধু তারা নেবে না, বাংলাদেশ সরকার বছর বছর তাদের মোটা অঙ্কের মাশুল দেবে। ১৫ বছরে তারা ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে নিয়ে যাবে ১৩৫ কোটি ডলার। এর পর ‘এত বেশি সুদ পুরো প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং দেশের ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে’ কিনা প্রশ্ন করা হলে নাম প্রকাশে নারাজ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘উচ্চ সুদসহ ডলার নিয়ে যাওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরির বিষয়টি ঠিক। তবে প্রকল্পের গুরুত্ব ও পরিস্থিতি বিবেচনায় তখন অনাপত্তি না দিয়ে উপায় ছিল না।’

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম সমকালকে বলেন, ‘যে নামে অর্থ পাঠিয়েছে, সে নামে খরচ না করে অন্য নামে খরচ দেখানো তছরুপের নামান্তর ছাড়া কিছুই নয়। সেবা খাতে খরচ দেখানোর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘১৮ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ বা ঋণ যা-ই বলি, বিশ্বের কোথাও আছে নাকি? বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা নমনীয় শর্তের ঋণ অনুমোদন করি। বাণিজ্যিক ঋণ হলেও তা ৩ থেকে ৬ শতাংশের বেশি সুদ হয় না। এখানে ব্ল্যাকমেইল হয়েছে। এসব জনস্বার্থবিরোধী কার্যক্রম। এটা জনসম্পদ তছরুপ করা ছাড়া এদের কিছুই বলা যায় না।’
আড়ালে বসে কে হাসে?: বাংলাদেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি আসলে কার? মালিক বা স্বত্বাধিকারী বলতে যা বোঝায়, সেই ব্যক্তি কে বা কারা? এই স্বাভাবিক প্রশ্নটির জবাব খুঁজতে গিয়ে অস্বাভাবিক সব তৎপরতায় গড়া এক গোলকধাঁধার মধ্যে পড়তে হয় সমকালকে। কি যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার ডিভিশন অব করপোরেশন, কি বাংলাদেশের যৌথ মূলধনি কোম্পানি ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ের (আরজেএসসি) নথিপত্র- কোথাও কোনো মূল ব্যক্তির নাম-নিশানা নেই। ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যটি অবশ্য আগে থেকেই ‘করস্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত এবং নিজেদের আয় বাড়ানোর স্বার্থে রীতিমতো আইন করেই অনেক কিছু গোপন রেখে দেশি-বিদেশিদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ দেওয়া আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে রকম কোনো আইন নেই। তাই ব্যবহার করা হয়েছে আইনের ফাঁকফোকর। সঙ্গে আছে আইন লঙ্ঘনকারী প্রভাবশালী আর অসাধু মহলের তৎপরতা। এরই ধারাবাহিকতায় আরজেএসসিতে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের নিবন্ধন কোনো ব্যক্তির নামে হয়নি; হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ হোল্ডিংস, এলএলসি এবং এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ, এলএলসির নামে।

আরজেএসসিতে জমা দেওয়া নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড নিবন্ধন নেয় ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল, যার নম্বর সি-১৩০৪৬৪। এর অবস্থান ঢাকার কারওয়ান বাজারের পেট্রোসেন্টারের লেভেল-১১-তে। নিবন্ধন নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওই দুই কোম্পানির প্রতিনিধি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ হোল্ডিংস, এলএলসির ‘মনোনীত পরিচালক’ হিসেবে নাম রয়েছে ব্রিটিশ নাগরিক নিকোলাস স্টুয়ার্ট জেমস বেডফোর্ড ও মার্কিন নাগরিক র‌্যামন কারমা ওয়াংদির। আর এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ, এলএলসির মনোনীত পরিচালক হিসেবে নাম আছে স্টিফেন ম্যাথিউ কোবোসের। এ তিনজনই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে যুক্ত। আরজেএসসির তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে বেডফোর্ড ও কোবোসের আবাসিক ঠিকানা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উডল্যান্ডের ২৪৪৫ টেকনোলজি ফরেস্ট ভবনের লেভেল-৬ উল্লেখ রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এটি এক্সিলারেট এনার্জির হেডকোয়ার্টার। আর দু’জনেরই নামের পাশে অভিন্ন b.chowdhury@fma.com.bd এই ই-মেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করা হয়েছে। ই-মেইলের শেষাংশে ব্যবহূত এফএমএ ডটকম ডটবিডি বাংলাদেশের আইনি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এফএম অ্যাসোসিয়েটসের ওয়েব ঠিকানা।

ই-মেইল অ্যাড্রেসের বিষয়ে এফএম অ্যাসোসিয়েটসের ওয়েবসাইটে দেওয়া হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। আবদুর রহমান নামের একজন গতকাল এ প্রতিবেদককে জানান, ই-মেইল নম্বরটি এফএম অ্যাসোসিয়েটসের এ এইচ এম বেলাল চৌধুরীর। এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জানতে চাইলে বলেন, এক্সিলারেট তাদের গ্রাহক।
আড়ালে বসে এসব অনিয়মের ফায়দা লুটছে কে বা কারা, তা বের করতে অনুসন্ধানের কমতি করেনি সমকাল। এক্সিলারেট এনার্জি সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে তাদের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেটি পর্যালোচনা করেও পরিস্কার বোঝা যায়, কেউ না কেউ রয়েছে আইনি খোলসের আড়ালে। প্রতিবেদনে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ, এলএলসিকে নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের কথা উল্লেখ থাকলেও এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ হোল্ডিংস, এলএলসির বিষয়ে কিছু বলা নেই। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ, এলএলসিতে তৃতীয় পক্ষের পুঁজি বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের বিপরীতে ওই তৃতীয় পক্ষ মোট আয়ের ২০ শতাংশ পেয়ে থাকে। তবে তৃতীয় পক্ষটি কে বা কারা, সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।

আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষায় কাজ করা বহির্নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান হাদি লুৎফুল অ্যান্ড কোংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুল হাদির সঙ্গে গত ২ এপ্রিল আইসিএবি কার্যালয়ে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। প্রতিবেদন দেখে তিনি সমকালকে বলেন, এক্সিলারেটের প্রতিবেদন দেখে ধারণা করা যায়, এখানে তৃতীয় পক্ষের গোপন বিনিয়োগ রয়েছে। অন্য দেশে এ ধরনের গোপন বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশে নেই।
মোহরাকাটায় নিরিবিলি-ছিমছাম: মহেশখালীর মোহরাকাটায় গভীর সমুদ্রে স্থাপিত এই ভাসমান টার্মিনালে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসকে প্রথমে বায়বীয় করা হয়। তারপর সেখান থেকে সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আনা হয় মোহরাকাটার কাস্টডি ট্রান্সফার মিটারিং স্টেশনে (সিটিএমএস)। সেখান থেকে আবার ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস জমা হয় চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। মহেশখালী-আনোয়ারা পর্যন্ত এই পাইপলাইন স্থাপন হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের টাকায়।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মহেশখালীতে গিয়ে সাগরে স্থাপিত ভাসমান টার্মিনাল পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে টার্মিনাল থেকে সাগরের তলদেশ দিয়ে যে স্টেশনে এসে তরল গ্যাস পরিশোধন হচ্ছে, সেখানে গিয়ে দেখা মেলে একজন কেয়ারটেকার ও একজন নিরাপত্তা প্রহরীর। এটি মহেশখালীর মোহরাকাটায় স্থাপিত কাস্টডি ট্রান্সফার মিটারিং স্টেশন (সিটিএমএস)। প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে কেয়ারটেকার গেলেন প্রকল্পের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের অফিসকক্ষে। সেখান থেকে ফিরে এসে জানালেন, প্রকল্প পরিচালক না থাকায় কেউ কথা বলবেন না।

তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যতটুকু সম্ভব, ঘুরে ঘুরে দেখার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এক সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে পাশাপাশি দুটি স্টেশন বসানো হয়েছে, যা লোহার নেটের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেখানে বড় বড় অনেক পাইপ বসানো। মোহরাকাটার এই সিটিএমএস মূলত চলছে পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানি জিটিসিএলের পরিচালনায়। এখান থেকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এলএনজি পরিশোধন হয়ে মাটির নিচ দিয়ে বসানো পাইপের মাধ্যমে যুক্ত হয় জাতীয় গ্রিডে। গ্যাসলাইনে কোনো কারণে সমস্যা দেখা দিলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য মহেশখালীর উত্তর নলবিলায় বসানো হয়েছে মেইনলাইন ভাল্ক্ব স্টেশন-১। সেখানে গিয়ে দেখা মিলল একজন নিরাপত্তা প্রহরীর। তবে এদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
গোপন দৌড়ঝাঁপ ঢাকায়: এই কারসাজির ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসে বেশ আগেই। কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব বিবেচনা করে শুরুর দিকে বিষয়টি সমাধান করতে মৌখিকভাবে বলা হয়েছিল। এ কারণে বিল সমন্বয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও এক্সিলারেট এনার্জিকে মৌখিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকজন কর্মকর্তা জানান, মৌখিক নির্দেশে কোনো কাজ না হওয়ায় প্রথমে ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। তারা লিখিতভাবে ব্যাখ্যা তলব করে এক্সিলারেট এনার্জির কাছে। এভাবেই কেটে যায় প্রায় ১০ মাস। কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই কোনো রকম সাড়া না পেয়ে শেষমেশ গত ৭ ডিসেম্বর ‘এক্সিলারেট এনার্জির বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না’ জানতে চেয়ে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরই ৩০ জানুয়ারির দায়সারা চিঠিতে সাত-পাঁচ বুঝিয়ে জবাব দেয় এক্সিলারেট।

গত ৭ এপ্রিল সমকালের পক্ষ থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে জানতে চাওয়া হয়- ২০১৭ থেকে ২০১৮ সাল সময়ে এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশ আপনাদের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি ৬৫ লাখ ডলার পাঠিয়েছিল। আংশিক অর্থের বিপরীতে পণ্য এলেও বাকি অংশের বিপরীতে পণ্য আসেনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংকটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শুরুতে সমকালকে বলেন, ‘আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আমি বলতে পারব না।’ এ সময় গত ৭ মার্চ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন- তা স্মরণ করিয়ে দিলে বলেন, ‘স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মাধ্যমে পাঠানো ওই অর্থ এরই মধ্যে সমন্বয় হয়েছে।’ অর্থ পাঠানোর ১২০ দিনের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৭ সালে অর্থ পাঠানোর এত দিন পর কেন সমন্বয় হলো- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বলতে পারছি না।’

সমকালের হাতে থাকা নথিগুলো বলছে, আইনি ব্যবস্থার সংকেত পেয়ে সেটা ঠেকাতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দেওয়া শুরু করে এক্সিলারেট এনার্জি। শোকজ পাওয়ার পর শুরুর দিকে ‘ফারুক অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ নামে একটি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হয়। তাতে কাজ না হওয়ায় গত ১৩ জানুয়ারি এক্সিলারেট এনার্জির পক্ষ থেকে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের অনুরোধ জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) এবং পেট্রোবাংলাকে চিঠি দেয়। চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উত্থাপিত আপত্তির বিষয়টি দ্রুত সমাধান করার অনুরোধ জানানো হয়।
আঁতাতের গন্ধ: এক্সিলারেট এনার্জির অনুরোধে সাড়া দিয়ে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ জানিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এই বিভাগের উপসচিব আবুল কালাম আজাদ স্বাক্ষরিত চিঠিটি পড়ে দেখা যায়, সেখানে এক্সিলারেট এনার্জির চিঠির রেফারেন্স দিয়ে নানা তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, “টার্মিনালের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইইবিএল যথাযথ প্রক্রিয়ায় স্থায়ী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানি করেছে। প্রকল্প নির্মাণের জন্য ইইবিএল ফ্রান্সের জিওসানকে ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট ও কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করে। জিওসান বিভিন্ন সময় প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানি করে। দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিটি ‘মাইলস্টোন পেমেন্ট (লাম্বসাম)’ তথা পণ্য অথবা সেবা, কিংবা উভয়ই পরিশোধ সম্পর্কিত।”

উপসচিবের ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা। টার্মিনালটির কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে বিধি অনুযায়ী বর্ণিত বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির অনুরোধ জানানো হলো।’

মন্ত্রণালয়ের এই চিঠিতে যে এক্সিলারেটের পক্ষে ওকালতির সুর ধ্বনিত হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু তাই নয়, এরই মধ্যে সুর নরম হয়ে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও। আইনি ব্যবস্থার উদ্যোগ থেকে সরে এসে এখন সমঝোতার ইঙ্গিত মিলছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ৭ মার্চ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক, এক্সিলারেট এনার্জি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকে এক্সিলারেট এনার্জির ফেরত না আনা অর্থেরও বিল অব এন্ট্রি দাখিল দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। বিল অব এন্ট্রি এক্সেপ্ট হলে তখন আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভান্ডারে ‘অমিল’ থাকবে না। ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ পাচারের এই ঘটনা নিয়ে ভবিষ্যতেও আর প্রশ্ন উঠবে না।

গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন- পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন অতিরিক্ত সচিব নাজমুল আহসান। গত বৃহস্পতিবার তিনি সমকালকে বলেন, এক্সিলারেট এনার্জি যে পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছিল, তার বিপরীতে পণ্য না আনা বা উচ্চ সুদে বিনিয়োগ দেখানোর বিষয়টি তার জানা নেই। বরং তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর একটি প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক তাদের ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতা আছে। আমরা চাইলে তারা আরও ১৬০ মিলিয়ন যোগ করে ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুট করতে পারবে। তবে এই প্রকল্পে অনিয়ম বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী উপসচিব আবুল কালাম আজাদকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, তাকে বদলি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ফিডব্যাক এসেছে কিনা জানতে হবে। এক্সিলারেটের এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে মন্ত্রণালয় বলতে পারে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু তারা সরকারের ক্লায়েন্ট (গ্রাহক), আমরা এটা বলতে পারি।’


শেয়ার করুন