ভাই সব, আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি হইছে

2015_11_08_18_56_41_o3KuPAikXQNtcdNuYcTCFPqRQdLX2w_originalসিটিএন ডেস্ক:
শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলা রায় পড়া শেষে চার আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। খবরটি কানে পৌঁছামাত্র উল্লাসে মেতে ওঠেন নির্মমভাবে খুন হওয়া রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান। শুধু উল্লাসই নয়, তিনি আদালতে উপস্থিত শত জনতার উদ্দেশে দুই মিনিটের একটি ভাষণও দিয়েছেন। রাজনের বাবার এমন আচরণে উপস্থিত জনতা ফাঁসি ফাঁসি স্লোগানে উত্তাল করে তুলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণ।

ছেলের খুনিদের ফাঁসি ঘোষণা হওয়ার পর তিনি উপস্থিত জনতাকে চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘ভাই সব শুনুন, আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি হইছে। আদালত চারজনকে ফাঁসি দিতে বলেছেন। আমি চাই আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকর হউক।’

রাজনের বাবার এমন বক্তব্য শুনে মহানগর আতদালত প্রাঙ্গণে শত শত জনতা ‘ফাঁসি..’ ‘ফাঁসি…’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। আবার আজিজুর রহমানের বক্তব্যের বাচনভঙ্গি দেখে অনেককেই নানা কথা বলতেও দেখা গেছে। কেউ কেউ মজা করে বলেন, ‘আজ যেভাবে রাজনের বাবা বক্তব্য রাখলেন তা দেখে মনে হচ্ছে তিনি জাতীর উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন!’

জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখার পর রাজনের বাবা আজিজ উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। এ সময় তিনি তার ছেলে হত্যা মামলার রায়ে খুশি বলে জানান। এছাড়াও সরকার, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে তিনি ধন্যবাদ জানান।

এর আগে আলোচিত এই মামলার রায়কে ঘিরে রোববার সকাল ৯টা থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এসে ভিড় করতে দেখা যায়। মানুষের চাপ সামলাতে জজ কোর্টের মূলফটক বাদে সব গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। নেয়া হয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। সকাল ৯টা ২৮ মিনিটে রাজনের আইনজীবী শওকত চৌধুরী আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। সকাল ১০টা ২২ মিনিটে রাজনের মা-বাবা ও তার ছোট ভাই আদালত গ্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়। এসময় তাদের সঙ্গে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই উপস্থিত হয়।

একপর্যায়ে বেলা ১১টা ১৮ মিনিটে আদালতে হাজির করা হয় মামলার আসামি কামরুলসহ অন্যদের। ১১টা ২৪ মিনিটে তাদেরকে কাঠগড়ায় নেয়া হয়। আসামিদের আদালতে হাজির করার সময় উপস্থিত জনতা তাদের ক্ষোভের কথা প্রকাশ করেন। তবে তাদের প্রতিবাদের ভাষা ছিল ফাঁসির স্লোগান। উচ্চস্বরে তাদের কণ্ঠে ছিল- ‘ফাঁসি চাই’, ‘ফাঁসি চাই’। এ সময়ও রাজনের বাবা উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমার ছেলে হত্যার বিচারের রায় ঘোষণা করা হবে। ওই রায় শুনতে আমি আদালতে উপস্থিত হয়েছি। আশা করছি খুনিদের ফাঁসি দেয়া হবে।’

অল্প সময়ের ওই বক্তব্যে রাজনের বাবা আরো বলেছিলেন, ‘ছেলে হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই আমি।’ এসময় উপস্থিত সবাই ফাঁসি ফাঁসি বলে স্লোগান দিতে থাকে।

এদিকে রায় ঘোষণার পুরোটা সময়জুড়েই জনতার কণ্ঠে ছিল আগুন। এমনকি বেলা দেড়টার দিকে যখন রায় ঘোষণার পর অভিযুক্তদের আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছিল, তখনও কামরুল, ময়না, বাদল, পাভেলদের ধিক্কার জানায় তারা।

প্রসঙ্গত, বহুল আলোচিত শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলায় মূল হোতা কামরুলসহ চারজনের ফাঁসি, একজনের যাবজ্জীবন, তিনজনের সাত বছরের কারাদণ্ড, দু’জনের এক বছরের কারাদণ্ড এবং তিনজনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।

এর আগে গত ২৫ অক্টোবর রাজন হত্যা মামলায় আসামি যাচাইবাছাই শেষ হয় এবং যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। ২৬ অক্টোবরও চলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। পরদিন আদালত আজ ৮ নভেম্বর রায়ের তারিখ ধার্য করেন।

এর আগে গত ৮ জুলাই সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে শিশু সামিউল আলম রাজনকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রতিবাদে বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে গোটা দেশ। ঘটনার তীব্রতায় বাধ্য হয়ে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তায় একে একে গ্রেপ্তার হয় রাজনের ঘাতকরা।

রাজন হত্যাকাণ্ডের পর তার বাবা আজিজুর রহমান পুলিশের বিরুদ্ধে খুনিদের বাঁচানো এবং অসদাচরণের অভিযোগ তুলেন। অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে খুনিদের বাঁচানোর অভিযোগও তুলেন তিনি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার রোকন উদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত করে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় গত ২৪ জুলাই জালালাবাদ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম ও জাকির হোসেনকে বরখাস্ত এবং ওসি (তদন্ত) আলমগীরকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে ২৭ জুলাই আলমগীরকে বরখাস্ত করা হয়।


শেয়ার করুন