ব্রেক্সিট: কী প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে?

2016_06_24_23_48_27_7nx8iDvKVDymOfVFxOLL79eweN82Gs_originalসিটিএন ডেস্ক:
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিল ব্রিটিশরা। ৪১ বছর পর ২৮ সদস্যের জোটটি থেকে ব্রিটেনের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ায় খোদ জোট যেমন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তেমনি এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে না পড়লেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন ব্রিটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। যদিও পক্ষে-বিপক্ষে পার্থক্যটা খুব বেশি নয়। বলতে গেলে এই ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে গ্রেট ব্রিটেন। গণভোটের ফলাফল প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন।

এই অস্থিরতার প্রভাব ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্রিটেনসহ আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার ও মুদ্রাবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গত ৩১ বছরের মধ্যে পাউন্ডের রেকর্ড দরপতন হয়েছে। যেহেতু ব্রিটেন ও ইইউ এর ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে সেহেতু এই প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা মনে করছেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বৃহত্তম রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রিফারেন্স (জিএসপি) পাচ্ছে বাংলাদেশ। এখন যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এ সুবিধা পাওয়ার জন্য নতুন করে আলোচনা করতে হবে। ফলে রপ্তানির বড় বাজার হারাতে পারে বাংলাদেশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল ঘোষণার পরে পাউন্ডের ব্যাপক দরপতন হয়েছে। এর ফলে দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার মধ্যে পড়তে পারে ব্রিটেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয় কমে যাবে। ফলে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স কমতে থাকবে; যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ৯২০ কোটি ইউরো মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে এসব দেশ থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়েছে মাত্র ১৫০ কোটি ইউরো মূল্যমানের। ২০০১ সাল থেকে ইইউ’র বাজারে জিএসপি সুবিধা ভোগ করার ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশ বরাবরই উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে।

দীর্ঘ তিরিশ বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ জমির। বিশিষ্ট এই কূটনীতিক বাংলামেইলকে বলেন, নাকরিকদের সিদ্ধান্তে দেশটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আর এর প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে না পড়লেও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জিএসপি সুবিধা নিয়েও বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

এ প্রসঙ্গে শুক্রবার সন্ধ্যায় মুঠফোনে বাংলামেইলের সঙ্গে কথা বলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বিশেষ করে পোশাক শিল্পের বড় বাজার যুক্তরাজ্য। কারণ সেখানে আমাদের রপ্তানিকারকরা জিএসপি সুবিধা পাচ্ছেন। অর্থাৎ ইইউভুক্ত সব দেশেই এই সুবিধা পাচ্ছেন। জোট থেকে আলাদা হওয়ায় যুক্তরাজ্যে সুবিধাটি পাওয়ার জন্য নতুন করে কাজ করতে হবে।

ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের অভিবাসনেও স্থায়ী সমস্যায় পড়তে হবে বলে মনে করেন প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ অবশ্য ব্রিটেনের স্থিতিশীলতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তিনি মনে করছেন, জোট ছাড়ার কারণে ব্রিটেন একটু সমস্যায় পড়বে। ফলে বাংলাদেশও একটু প্রভাবিত হবে। তবে ব্রিটেনের গণতন্ত্র দৃঢ়, তারা দেশকে ভালোবাসে। তাদের আত্মবিশ্বাস আছে। সুতরাং তাদের অর্থনীতি চাঙা রাখতে পারবে। আর বাংলাদেশও ব্রিটেনের কাছ থেকে আগের চেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করবে বলে তার আশা।

১৯৭৫ সালের গণভোটে ব্রিটেনের জনগণ ইইউ জোটে যোগ দেয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল। যদিও সাধারণ মুদ্রা ইউরোকে তারা গ্রহণ করেনি। ৪১ বছর পর সেই জোটে না থাকার পক্ষে ৫২ শতাংশ মানুষই ভোট দিল। ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যপথে যে ভাঙন সৃষ্টি করেছে সেটা পুঁজিবাজার ও মুদ্রাবাজারে জড়িত মানুষের পক্ষে দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে। অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে বহুদিনের স্থিতিশীলতা। এমনকি নীতিনির্ধারকরা জানেন না সঙ্কট কীভাবে মোকাবেলা করবেন। অশান্তির পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।

অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে বড় যে বিপদটা আসবে সেটা হলো বিদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। এর ফলে ব্রিটেনের নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান কমে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুরশিদ কুলি খানের মতে, ইইউ থেকে বিচ্ছেদের ফলে ব্রিটেনে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ঘটবে। যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। কারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয় কমে যাবে, অন্যদিকে তাদের জীবনযাত্রারও মান বেড়ে যাবে। এরফলে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স আসাও কমবে।


শেয়ার করুন