বুকে যদি বারুদ থাকে, জ্বলো

tasleema1তসলিমা নাসরিন

দুর্মুখরা কত কথাই বলে। এদের কথায় কান দিতে নেই। আমি দিইও নি। কান দিলে এদের জিভে যে ব্যাকটেরিয়া থাকে, সেই ব্যাকটেরিয়া আমার কানে ঢুকে কান পচিয়ে দেবে। কিন্তু সব কিছুর তো একটা সীমা আছে, সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে অনেকদিন থেকে আমি লক্ষ করছি, আমি ভাল লিখি এতে হয়তো অনেকের আপত্তি নেই, আপত্তি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। তা ছাড়াও আমার লেখা যারা পছন্দ করে না, তারা, লেখা যারা পছন্দ করে তাদের সঙ্গে যখন তর্কে মাতে তখন একটি কথাই সবচেয়ে বেশি টানে যে, আমি একের বেশি বিয়ে করেছি কেন? (এই বিয়ের সংখ্যা নিয়ে লোকের মধ্যে নানা রকম মতভেদ আছে। কেউ বলে তিন, কেউ বলে চার, কেউ পাঁচ, কেউ সাত।) বিয়ের সংখ্যা কত এবং কী নাম আমার প্রাক্তন স্বামীদের-এ-নিয়ে লোকের উৎসাহের সীমা নেই। যারা আমার লেখার একটি অক্ষরও কখনও পড়েনি, তারাও লোকমুখে শোনা আমার স্বামীদের নাম ঠোঁটস্থ রাখে। যাদের নাম আমার স্বামী তালিকায় দেওয়া হয়, তারা কি আসলেই আমার স্বামী ছিল? তাদের সঙ্গে কি আমি কখনও বসবাস করেছি? সেদিন একটা তথ্য শুনলাম বাংলাদেশে নাকি কোর্টের বিয়েকে বিয়ে হিসেবে ধরা হয় না, কাজি ডেকে কাবিন করে বিয়ে হলেই নাকি আইনের চোখে বিয়ে। আমার তবে কোনও বিয়েই হয়নি। বিয়ে হয়নি, অথচ বিয়ে করেছি বলে দুর্নাম কামিয়েছি জীবনভর।
আমার লেখা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে লোকে আমার বিয়ে নিয়ে মাথা ঘামায়। বিয়ে ব্যাপারটি আমার নিতান্তই ব্যক্তিগত। আমিই জানি কবে কার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক হয়েছে এবং সেই সম্পর্ক কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। আমি ছাড়া আর কারও কি সাধ্য আছে এ-সব জানে? অথচ পত্রিকাগুলোর ভাব দেখে মনে হয় তারাই বেশি জানে আমার চেয়ে। এমন লোকের নামও আমার স্বামী হিসেবে প্রচার হয়, যাকে আমি আদৌ চিনি না। আমি প্রায়ই ভাবি এ-সবের কারণ কী? লোকের এত উৎসাহ কেন, কার সঙ্গে আমি ঘুরেছি, কার সঙ্গে আমি শুয়েছি -এ-সবে? আমি যার সঙ্গেই শুই, সে বিয়ে করে হোক, সে একেবারেই আমার শারীরিক ব্যাপার। শারীরিক ব্যাপারগুলো, আমি যতদূর জানি, যার-যার নিজস্ব ব্যক্তিগত। মানুষ মানুষকে ভালবাসে, সম্পর্ক স্থাপন করে। এ মানুষের অন্তর্গত নিয়ম। তবে দেখতে হবে কেউ কারও ক্ষতি করছে কি না। আমি জানি, আমার কাছের অনেক মানুষই জানে, আমি কারও কোনও ক্ষতি কখনও করিনি বরং স্বামী নামক কিছু নাম যে আমার নামের পাশে লেখা হয়, তাদের অনেকে বিভিন্ন কায়দায়, বিভিন্ন ঢঙে আমার ক্ষতি করে গেছে, আমাকে অপমান করে গেছে। যেহেতু নিজেকে অপমানিত আমি হয়তো দিতে চাই না, সম্পর্ক ছেদ করতে হয়েছে আমাকে। লোকের কথায় মনে হয়- কারও সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ না হলে তারা খুব খুশি হত, অর্থাৎ আমি যদি অপমানিত হতে হতে তিল তিল করে মরে যেতাম। তারা বলতে পারত মেয়ে খুব চরিত্রবতী। পুরুষের অন্যায়ের কাছে নিজেকে বলি হতে দিলে সকলে আমাকে লক্ষ্মী মেয়ে বলবে সে আমি জানি, কিন্তু নিজেকে হত্যা করে আমি এই সব লোককে খুশি করতে মোটেও রাজি নই। এতে আমার কিছু যায়-আসে না। আমার স্বামী হিসেবে যাদের নাম প্রচারিত হয়, তাদের কাউকে কাউকে আমি চিনি, তবে এ-কথা সত্য, তাদের সঙ্গে আমার মানসিক এবং শারীরিক দূরত্ব সব সময়ই খুব বেশি ছিল। আমার সঙ্গে যার অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক, তার নাম এখনও নিন্দুকদের অশুভ হাতের কবলে পড়েনি, এ বোধহয় আমারই জয়।
আমার লেখা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে লোকে আমার বিয়ে নিয়ে মাথা ঘামায়। বিয়ে ব্যাপারটি আমার নিতান্তই ব্যক্তিগত। আমিই জানি কবে কার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক হয়েছে এবং সেই সম্পর্ক কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। আমি ছাড়া আর কারও কি সাধ্য আছে এ-সব জানে?
তাদের স্বরচিত কায়দায় তারা ঘোঁৎঘোঁৎ করছে,করুক। তবে এই ঘোঁৎঘোঁৎ শব্দ এত বিকট হয়ে উঠেছে যে, আমি আশঙ্কা করি এই সমাজে কি মেয়েরা কখনও মানুষের অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে? আমাকে ধ্বংস করে দিতে চাইছে মৌলবাদীরা এবং ‘পুরুষ’রাও বটে। আমি তাদের অপপ্রচারে, অপমানে এতটুকু কাতর হব না। আমি দাঁড়াবই মনুষ্যত্ব, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদ নিয়ে। অজ্ঞতা যখন চারিদিকে প্রকট হয়ে ওঠে, তখন কথায় নয়, কাজে মন দেওয়াই ভাল। মানুষের মঙ্গলের জন্য কিছু যদি করে যেতে পারি, মেয়েদের ভোঁতা মস্তিষ্ক যদি সামান্য হলেও তীক্ষè, তীব্র প্রতিবাদী করতে পারি, তবেই আমার ভেতরের দহন কমবে। এই নষ্ট সমাজে মেয়েরা যদি নিজেকে আর অপমানিত হতে না দেয়,আমি স্বস্তি পাব। না হয় নিজে সব দুঃখ শোক, দুঃসহ যন্ত্রণা আর অসুখ সয়ে অন্যকে সুখ দিয়ে গেলাম। অপবাদ, অকল্যাণ নিজের ভাগে নিয়ে অন্যের ভাগে আমি সব কল্যাণ দিতে রাজি। আমার থোকা থোকা কষ্ট নিয়ে লোকে আজ উল্লাস করছে, পত্রিকাগুলো ও নিয়ে বাণিজ্যও করছে কম নয়, কিন্তু আশা করতে ক্ষতি কী- আমি পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়েছি, আমাকে ছুঁয়ে আর কেউ অগ্নি হোক। আমি পথ হব নারীর পদতলে—তবুও তারা দাঁড়াতে শিখুক, হাঁটতে শিখুক। বাংলাট্রিবিউন
লেখক: কলামিস্ট


শেয়ার করুন