কক্সবাজার আঞ্চলিক 

পাসপোর্ট অফিসে গ্রাহক হয়রানি বেড়েই চলছে !

imagesএম.শাহজাহান চৌধুরী শাহীন :

কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস হতে পাসপোর্ট ইস্যু করে গত সাড়ে ৫ বছরে প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা আয় করেছে বহিরাগমন পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এর পরেও গ্রাহক হয়রানি কমেনি। দ্বিগুন বেড়েছে পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম-ভোগান্তিÍ। বছরের পর বছর ধরে চলা কর্মচারীদের দুর্নীতি আর দালাল সিন্ডিকেটের আধিপত্য এখন যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এখানে। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারির সৃষ্ট আইন ও উপ-সহকারী পরিচালকের হেয়ালিপনা এবং ইচ্ছাকৃত অনিয়মের কারণে এখানকার অবস্থাকে আরো নাজুক করেছে। তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে ভোগান্তির শিকার লোকজন। তারা আবারও বিক্ষোভসহ আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।
রাজস্ব আয়ের দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে এ অফিসটি। কিন্তু অনেক দিন প্রচলিত ‘দুর্নীতির আখড়া পাসপোর্ট অফিস‘ এই কথা। আয়ের ক্ষেত্রে যতটা এগিয়ে যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি এগিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিতে। পাসপোর্ট অফিসের বাইরে, ভেতরে যেখানে যাবেন সেখানেই ওই একই শব্দ! ঘুষ আর দুর্নীতি।

সুত্রে জানা যায়, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি ২০০৯ সালের জুন মাসে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ৩য় তলায় আনুষ্টানিক যাত্রা শুরু করে। শুরুতেই এ অঞ্চলের অধিবাসীদের হাতে লেখা পাসপোর্ট প্রদান করা হতো। জালিয়াতি ও হয়রানী কমাতে হাতের লেখা পাসপোর্ট বাদ দিয়ে পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর “মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ও ভিসা প্রকল্প’’ এর আওতাভুক্ত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় অধিনে বহিরাগমন পাসপোর্ট অধিদপ্তর এমআরপি পাসপোর্ট চালু হবার পর থেকে জেলাবাসি পাসপোর্ট সুবিধা দেয় হচ্ছে।

উপ-সহকারী পরিচালক শওকত কামাল গত কয়েক মাস সহকারী পরিচালকের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্ব পালন করেই সেবাদানকারী প্রতিষ্টানটিকে বির্তকিত করে তুলেছেন। সহকারী পরিচালক শরিফুল ইসলামের বদলি জনিত কারণে শুন্য পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। চিহ্নিত দালাল সিন্ডিকেটের সাথে বনিবনা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের পর তিনি নিজেই এখন নতুন দালাল সিন্ডিকেট সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু তিনি উপর মহল ম্যানেজ করেন বলেই অনেকটা ওপেন সিক্রেটে দুর্নীতি করছে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে উচ্চমান সহকারী আনোয়ার, অফিস সহকারী আকবর, নাইট গার্ড আবু বক্কর, ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোলার রাসেল মাহমুদ চৌধুরী ও আনসার জাহাংগীর। তারা আবার সৃষ্টি করেছে তাদের সহযোগী দালাল। এদের মধ্যে বেশ ক’জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলো, সাহাব উদ্দিন জনি, তার ভাগিনা সালাম, ঘোনারপাড়ার সাইফুল, ঈদগাওয়ের আমিন, চকরিয়ার সাইফুল ইসলাম, কালু সোলেমান, রাজুর ভাগিনা দাবীদার লম্বা ইলাহী, টেকনাফের জাফর আলম প্রকাশ বর্মী জাফর, চৌফলদন্ডির আমিন, খুরুশকুলের সুজন কান্তি, মিটাছড়ির নাছির উদ্দিন, টেকনাফের আয়াছ রনি, পেকুয়ার কুহুল আমিন। এরাই বর্তমানে পাসপোর্ট অফিস নিয়ন্ত্রণ করছে। এই পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরেই আশপাশে গড়ে উঠেছে দালাল অফিস ও দালাল সমিতি। তাদের দ্বারা অসম্ভবকে সম্ভব করা যাচ্ছে। রোহিঙ্গারাও কৌশলে পেয়ে যাচ্ছেন এদেশীয় পাসপোর্ট।

আবেদনকারীরা ফরম জমা দিতে যান অফিস সহকারী (এমএলএসএস) আকবরের কাছে। যে সব আবেদন ফরমের বিপরীতে ১২‘শ থেকে দেড় হাজার টাকা দেয়া হয় সেগুলো দ্রুত জমা নিয়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ডেলিভারি সিøপ দ্রুত দেয়া হয়। টাকা না দিলে ফরম ভুল হয়েছে, ফটো কপি পড়া যাচ্ছে না, নাম ঠিক নাই সহ ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে জমা নেয়া হয় না।
গতকাল ৮ নভেম্বর রোববার এই আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস অভ্যন্তরে দেখা গেলো আবেদন ফরম নিয়ে লাইনে দাড়িয়ে আছে অসংখ্য গ্রাহক। সকাল ৯টা হতে লাইনে দাড়িয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় ভেতরে ডুকার পালা হয় চকরিয়ার মোহাম্মদ রুবেল, একই এলাকার মোঃ শাকের ও সদরের ঈদগাও এর শাহ আলমসহ আরো অনেকের। কিন্তু চ্যানেল ফি’ না দেয়ায় ফরমে ভুল আছে বলে জমা নেয়নি। তারা এ বিষয়ে উপ-সহকারী পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করার চেস্টা করলে তাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন আনসার মিনার। ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহককে অভিযোগের দেয়ার মতো কোন সুযোগ আনসার সদস্যরা দেন না। আর দিলেও কাজ হয় না। কারণ সরষে ক্ষেতে রয়েছে ভূত।

চকরিয়ার রুহুল আমিন নামের এক দালালকে দু’টি আবেদন ফরমসহ ২৮‘শ টাকা দিলেই তিনি চ্যানেলে আনসার দিয়েই পাঠিয়ে শেষ পর্যন্ত বিকাল ৪টার দিকে জমা করান।
তারা জানান, নিয়ম মেনে পাসপোর্ট করতে আসা যেন অপরাধ। ঘুষ ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়ার নুন্যতম অধিকার এখানে নেই।
শেষ পর্যন্ত ফরম জমা দিতে না পেরে ঈদাগওয়ের বয়োবৃদ্ধ শাহ আলমসহ আরো অনেকে জানান, দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে , গত এক সপ্তাহ ধরে একটা পাসপোট করার জন্য ৪ বার এ পাসপোর্ট অফিসে এসেছি। তারা এক এক সময় এক এক ভুল হয়েছে বলে ফিরিয়ে দিচেছ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এ অফিস যেনো এক নরকে পরিণত হয়েছে। সেখানে কোন ভাল মানুষ নাই আছে শুধু শয়তান আর শয়তান।

পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, রোববার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ২০৭ টি ফরম জমা পড়েছে। তবে ২টি ফরম ছাড়া অবশিষ্ট ফরম জমা নিতে চ্যানেল ফি নেয়া হয়েছে।
একই সুত্রটি জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে জুন থেকে চলতি বছর অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ বছরে বিশেষ (জরুরী) ও সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করে প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকার রাজস্ব সরকারী কোষাগারে জমা হয়েছে। তিনি দাবী করেন, এখাতে চ্যানেল ফি’র নামে কর্মকর্তা কর্মচারীরা অবৈধ আয় করেছে অন্তত ৫ কোটি টাকার উপরে।

এদিকে, শহরের লালদীঘির দক্ষিণপাড়স্থ সোনালি ব্যাংক শাখায় টাকা জমা দিতে গিয়ে দালাল চক্রের হয়রানিতে অতিষ্ট পাসপোর্টের গ্রহকরা। দালাল চক্রের দাপটে কোনঠাসা সাধারন মানুষ জমা দেয়র জন্য পাসপোর্ট তৈরির সরকারি ফি তাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এজন্য পারিশ্রমিক হিসেবে দিতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। বিনিময়ে যে ব্যাংক রশিদটি পাচ্ছেন অনেক সময় তা প্রমাণিত হচ্ছে ভুয়া বলে। অনেক সময় দালালদের হাতে প্রতারিতও হচ্ছে। এবিষয়ে উপ-সহকারী পরিচালক শওকত কামালের সাথে মোবাইলে কথা বলতে চাইলে তিনি আগামী কাল ( সোমবার) অফিসে এসে তথ্য নিতে বলেন।

আলম নামের এক গ্রাহক জানালেন, গত এক সপ্তাহ ভোগান্তির শিকার হয়ে যখন আমি পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মচারীকে ১২‘শ টাকা ঘুষ দিলাম তখন সে ওই একসপ্তাহের কাজটা ৩০ মিনিটে করে দিলো।

তিনি জানালেন, চিন্তার বিষয় হচেছ এটা, যে ( কর্মচারী আকবর) আমাকে দিনের পর দিন ভুল হয়েছে বলে ফিরিয়ে দিতো আজ সেই ব্যক্তি আমার ফরমে স্বাক্ষর করে দিলো আর জমাও নিয়ে নিলো। অবশ্য পাসপোর্ট আমার খুব জরুরী বলে হয়রানী হতে নিস্তার পেয়েই খুশি হয়ে টাকা দিলাম। এ কোন দেশে বসবাস করি আমরা,এর থেকে আমরা কি অচিরেই রেহাই পাবো ?

গতকাল রোববার পাসপোর্ট ডেলিভারী নিয়ে আসা মনছুর আলম নামের এক প্রবাসী জানালেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে শেষের দিকে এই পাসপোর্ট অফিসে মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট রেন্যু করতে যখন এসে ছিলাম নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। এখানে অবৈধ ভাবে মানুষকে জিম্মি করে আমাদের মতো প্রবাসিদের নানা ভাবে হয়রানি করে নির্লজ্জ ভাবে এরা টাকা নিচ্ছে। তা নিজে না দেখলে কোনদিন বিশ্বাসও করতামনা ।

তিনি বলেন, যখন পরিবার পরিজন ছেড়ে প্রবাসে ছিলাম সেখানে এ রকম পরিস্থিতি দেখিনি। আমরা অসহায় প্রবাসিরা এখানে এসে এই নির্লজ্জ মানুষগুলোর কাছে আত্মসম্পর্ণ করা ছাড়া আরকোন পথই ছিলনা। এরাই তো রাতারাতি বড়লোক হয়ে দেশের ক্ষতি করছে, কারন একবার ভাবেন কেউ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বেঁচে থাকতে হিমসিম খায় আর এই পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারীরা টাকার পাহাড় বানায়।

এই প্রবাসী জানালেন, দুর্নীতিবাজ আর দালালদের উৎখাত না করলে সাধারন মানুষের ভোগান্তি কমাতে পারবে না। সরকার চাইলে সবকিছুই সমাধান করতে পারেন। ভোগান্তি ও দুর্নীতি বন্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর দাবী জানিয়েছেন তিনি।


শেয়ার করুন