উপকূলীয় নদী সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ

দেশের ১৯ উপকূলীয় এলাকায় নেমে আসছে বিপর্যয়, ৫০ বছরে বাস্তুচ্যুত হবেন ৩০ লাখ মানুষ

সলাম মাহমুদ, কুয়াকাটা থেকেঃ

‘স্বর্গতুল্য বঙ্গভূমি’ নামে পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অঞ্চল সেই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে। যে নদ-নদীগুলোর জল ও পলির আশির্বাদ নিয়ে ‘স্বর্গভূমি’ হয়ে উঠেছিল সেই নদ-নদীই এখন বিলীন হতে বসেছে। দেশের ১৯টি উপকূলীয় এলাকা ঘিরেই তৈরি হয়েছিল বিস্তীর্ণ যে অঞ্চল সেই অঞ্চলে মানুষের লোভের শিকার হয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসছে। সেই বিপর্যয় বিস্তীর্ণ উপকূলকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক সংকটের মুখের ফেলেছে। যেই সংকটে আগামি ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জলবায়ূ উদ্বাস্তুর হারকে ৭ গুণ বাড়িয়ে দেবে। আর আগামি ৫০ বছরের মধ্যে আর ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নদী ভাঙ্গন, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতাবৃদ্ধি, যত্রতত্র অবাধে অবকাঠামো নির্মাণ, নদীগুলোতে পলিপ্রবাহে মাত্রাতিরিক্ত বাধার সৃষ্টি, বাগদা চিংড়ি চাষ করতে অবাধে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাঁধ কেটে লবণপানি ঢোকানো, যথেচ্ছা মৎস্যশিকার, মাটির উর্বরা শক্তি হৃাস দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, নদ-নদী ও উপকূলের মানুষ গুলোকে নিঃস্ব করে তুলছে।

এসব কারণে মানুষ ঘর-বাড়ি, জমি হারিয়ে বাঁচার তাগিদে জন্মভিটার মায়া ছেড়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছেন। গণহারে বন ধ্বংস ও মাত্রাতিরিক্ত কার্বণ নিঃসরণে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে জমাট বরফ গলতে শুরু করেছে। সেই বরফগলা পানি মিশে ধীরে ধীরে সাগরের উচ্চতা বাড়ছে। যা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো সাগর তীরবর্তী দেশগুলোকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা বলছেন, এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। এখনই নদ-নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সময়। আমাদের উপকূলের মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে। রক্ষা করতে হবে আমাদের বিস্তীর্ণ উপকূল।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘উপকূলীয় নদী সম্মেলনে’ বক্তাগণ এসব কথা বলেছেন। তারা মনে করছেন, বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে নদী বাঁচাতে হবে। আর নদীকে বাঁচাতে হলে উপকূল রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সম্মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে।

২৯ জানুয়ারি, শনিবার পটুয়াখালী জেলার মহিপুর উপজেলার কলাপাড়া ইউনিয়নের কুয়াকাটার হোটেল গ্রেভার ইন ইন্টারন্যাশনালের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এই সম্মেলনে ভার্চয়ালি প্রধান অতিথি ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে উপকূলীয় নদী সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্প, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস জয়েন্ট কো-অপারেশন প্রোগ্রাম, রিভার এন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি), পরিবেশ ও নদী রক্ষা ফাউন্ডেশন ও গ্রীণ প্ল্যানেট।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্টিত উপকূলীয় নদী সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া, ওয়াটার কিপার বাংলাাদেশ এর সমন্বয়কারি ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল ও রিভার এন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ।

এই সম্মেলনের সহযোগী পার্টনার হিসেবে রয়েছে হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি, ইসাবেলা ফাউন্ডেশন, নেকম, নদী অধিকার মঞ্চ, ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব রিভার এন্ড এনভায়রনমেন্ট ও রিভার বাংলা।

উদ্বোধনী অনুষ্টানের শুরুতেই শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুহাম্মদ মনির হোসেন। উদ্বোধনী সেশনে মূল আলোচক ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের পরিবেশ ও জলবায়ূ বিশেষজ্ঞ মো. মনির হোসেন চৌধুরী।

আরও আলোচনা করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাগেরহাট জেলার আহবায়ক নূর আলম শেখ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কলাপাড়ার সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মান্নু, বাপা তালতলীর সমন্বয়ক আরিফুর রহমান, ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক) রোমান ইমতিয়াজ তুষার এবং পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এইচ এম সুমন।

প্রধান অতিথি সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার তাঁর ভার্চুয়াল বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সরকার দেশের প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় রক্ষা করতে অত্যন্ত আন্তরিক। সরকার ২০৩০ সালকে সামনে রেখে কাজ করছে। বর্তমান সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আগামি ১০০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদ, দূর্যোগ মোকাবেলা, নদী রক্ষা করতে মাঠে ময়দানে কর্মী বাহিনী তৈরি করে একসাথে কাজ করতে হবে।

তাঁর মতে, সরকার পরিবেশ রক্ষায় এতো বেশি আন্তরিক যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নিজের দলের নেতা-কর্মীদেরও কখনও ছাড় দেন না।

বাংলাদেশের নদী রক্ষায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও আন্তরিক ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন সরকারের সিনিয়র এই সচিব।

বিশেষ অতিথি প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, দেশে চার ধরণের নদী রয়েছে। সেখানে দুই ধরণের নদী হলো উপকূলীয় নদী ও পাহাড়ি নদী। উপকূলীয় নদীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ হলেও নির্বিচারে চিংড়িঘেরের কারণে সেই নদীকেই ধ্বংস করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, উপকূলীয় নদী হলো সামুদ্রিক জীব-বৈচিত্রের প্রজনন ক্ষেত্র। তাই উপকূল ও উপকূলীয় নদী রক্ষা করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে জীবন ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, শুধু মাছ নয়, পাখিরও আধার হলো এই উপকূল। এই উপকূলই পাখিদের বিচরণ ভূমি।

তিনি বলেন, উপকূল ভালো রাখতে হলে একসাথে মিলে মিশে কাজ করতে হবে।

তাঁর মতে, প্রত্যেক মানুষেরই কিছু না কিছু ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতার সাথে কিছুটা মমতা মিশিয়ে কাজ করলেই দেশটা ভালো থাকবে। নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষায় মেসেজ পৌঁছে দিতে হবে। তা ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে মাটির সাথে পদচারণা করাতে হবে। যা এখন হচ্ছে না। তরুণ প্রজন্ম এখন মোবাইল প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের ফেরাতে হবে।

শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা উপকূলীয় নদী সম্মেলনের উদ্বোধনী ও একাডেমিক সেশনে পরিবেশ রক্ষায় আগামি ১০০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ নিয়ে বিষদ আলোচনা করেন ৫ জনের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এদের মধ্যে মূল আলোচনায় ছিলেন জেপিসি, বাংলাদেশ-ন্যাদারল্যান্ড এর প্রিন্সিপাল স্পেশালিষ্ট মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র স্পেশালিষ্ট ড. ফারহানা আহমেদ, এসোসিয়েটস স্পেশালিষ্ট কে এইচ রাজিবুল করিম, রিসার্স কনসালটেন্ট এটিএম সাইদুল কবির ও রিসার্স কনসালটেন্ট চম্পা রাণী সাহা।

এবারের উপকূলীয় নদী সম্মেলনে বক্তাগণ বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা মূলত ১৯টি। এর মধ্যে ১৬ জেলা প্রত্যক্ষভাবে উপকূলবর্তী। এগুলো হলো পূর্ব-উপকূলের ৬ জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর, মধ্য-উপকূলের ৭ জেলা ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা ও শরীয়তপুর এবং পশ্চিম-উপকূলের ৩ জেলা খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। এছাড়াও যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জকেও উপকূলীয় এলাকা হিসেবে ধরা হয়।

তাদের মতে, টেকনাফের নাফ নদের মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। বিশাল এই উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য দারুণ এক সম্ভাবণার ভান্ডার।

বিশেষজ্ঞ বক্তাগণ বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সামাজিক ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে উজ্জল সমৃদ্ধ এই উপকূল এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে- এই উপকূল কী লবণাক্ততাসহ নিস্ফলা হয়ে যাবে? ভাবতে হবে- এই বিপর্যয় থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে। সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। শুরুটা আজই করতে হবে।

এবারের নদী সম্মেলনে শ্লোগান উঠেছে- ‘বাঁচাও উপকূল, ফেরাও সম্ভাবনা’।


শেয়ার করুন