দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে

01অভিযান দেশজুড়ে, আটক ৫৩ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা তালিকায় ২০০ বড় দুর্নীতিবাজ

সিটিএন ডেস্ক :

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। সরকারের জিরো টলারেন্সের নীতি মাথায় নিয়েই মাঠে নেমেছেন দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্বে আসার এক মাসের মধ্যেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে দুদক। অভিযান শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যেই সরকারি বিভিন্ন দফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৫৩ জনকে গ্রেফতার করেছে দুদক। গতকালই ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর, জামালপুর ও কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩ জনকে। আসছে এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্রেফতার করতে প্রস্তুত করা হয়েছে আরও দুই শতাধিক ব্যক্তির তালিকা। ইতিমধ্যেই দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে ৩২ ব্যাংকার ও ১৯ ব্যবসায়ীসহ শতাধিক ব্যক্তির ওপর। তবে সবার আগে বর্তমানে দায়ের থাকা দুদকের মামলাগুলোর আসামিদের মধ্যে যারা জামিন না নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা আসবেন গ্রেফতারের আওতায়। সেই সঙ্গে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে এতদিন জমে থাকা শত শত মামলা। দুদকসূত্রের তথ্যানুসারে, ২৭ মার্চ রাতভর অভিযান চালিয়ে আলোচিত ব্যাংক কেলেঙ্কারির একাধিক আসামিকে গ্রেফতারের মধ্যেই শুরু হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান। এর পর থেকে প্রতিদিন ও প্রতি রাতেই চলছে অভিযান। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে গ্রেফতারের আওতায় আনার লক্ষ্যে দুদকের দুই শতাধিক এজাহারভুক্ত আসামির তালিকা নিয়ে অভিযান চলছে। এ তালিকায় আছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিনিয়র কর্মকর্তা, ঋণের নামে অর্থ আত্মসাত্কারী ব্যবসায়ী, সেবা সংস্থার প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, এলজিইডি, রাজউকের প্রকৌশলী, বিদ্যুৎ, তিতাস, ওয়াসাসহ সেবা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা, অর্থ আত্মসাত্কারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অন্যরা। এর মধ্যে শুধু বেসিক ব্যাংকেরই ৫৬টি মামলায় ১৫৬ জন আসামি আছেন তালিকায়। ইতিমধ্যেই তিনজন ঋণগ্রহীতা ও বেসিক ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়েছেন। এজাহারভুক্ত কোনো আসামি যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন সেজন্য ৫৬টি মামলার আসামিদের নাম-ঠিকানা ও মামলার তথ্য উল্লেখ করে ইমিগ্রেশনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন ছয় তদন্ত কর্মকর্তা। জানতে চাইলে দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্ত কার্যক্রমে দুদক কর্মকর্তারা স্বাধীন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় যদি মনে করেন এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা প্রয়োজন, তদন্ত কর্মকর্তারা তাকে গ্রেফতার করবেন। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি জিরো টলারেন্স। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণবকুমার ভট্টাচার্য্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা পৃথক অভিযানে ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর, জামালপুর ও কুমিল্লা থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের সুপারভাইজার ছফির উদ্দিনসহ রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা থেকে ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে দুদক। প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া শাখার রূপালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম, ময়মনসিংহের রামভদ্রপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. রোকনুজ্জামান, একই জেলার ধোবাইড়া উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম, ওই জেলার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মঈদুল ইসলাম, জুনিয়র হিসাব সহকারী হোসনে আরা; কুমিল্লার বাসিন্দা মনিরুল হক, রাজউকের সুপারভাইজার ছফির উদ্দিন; যশোর হাউজিং এস্টেটের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোক্তার আলী; রাজধানীর আরামবাগের মেসার্স হ্যান্ডি ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার খালেদ সাইফুল, সেগুনবাগিচায় সিজিএ সমবায় ঋণদান সমিতির ক্যাশিয়ার আবদুল কাদের, অগ্রণী কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স মালটিপারপাসের সহ-সভাপতি এম এ সাত্তার; জামালপুর গ্রামীণ ব্যাংকের ছনকান্দা শাখার সাবেক সিনিয়র কেন্দ্র ব্যবস্থাপক আবদুল ওহাব ও চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জের পাইকারি ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী নাঈসুল ইসলাম। এর আগে ছয় দফায় ৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার পৃথক দুর্নীতি মামলায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, বগুড়া ও দিনাজপুর থেকে ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে দুদক। এর আগের দিন গ্রেফতার করা হয় আটজন। এরা হলেন শিক্ষা অধিদফতরের সিস্টেম অ্যানালিস্ট আবুল ফজল, ঢাকা সদর রেকর্ডরুমের সাবেক সাবরেজিস্ট্রার ভবতোষ ভৌমিক, হবিগঞ্জ হযরত শাহজালাল (রহ.) সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার হারুনুর রশিদ, সোনালী ব্যাংকের ময়মনসিংহের ভালুকা শাখার সাবেক ম্যানেজার আসাদুজ্জামান, একই শাখার কর্মকর্তা একরামুল হক খান, টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা প্রকল্পের সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, বগুড়ার কাহালুর বেলঘড়িয়া হাইস্কুল ম্যানেজিং কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য আল আমিন এবং দিনাজপুরের দাউদপুর ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় এসব আসামি পলাতক ছিলেন। সূত্র জানান, ২০১৫ সালে যাচাই-বাছাই শেষে ৪৭৮টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন ৮০০-এর মতো। এর বাইরেও নতুন-পুরনো এবং আদালত, থানা ও বিভিন্ন দফতর থেকে তদন্তের জন্য আসা বিভিন্ন ধারায় দায়ের হওয়া প্রায় ২০ হাজার মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুদকের দায়ের করা নিজস্ব মামলা ৩ হাজারের মতো। এসব মামলায় আসামি কয়েক হাজার। এদের অনেকেই জামিন না নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে নানাভাবে প্রভাবিত করে দীর্ঘদিন থামিয়ে রেখেছেন। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে পারছেন না কর্মকর্তারা। তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, চলমান অভিযানে চেষ্টা চালানো হচ্ছে বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে গ্রেফতারের। গত তিন দিনে তার যশোরের কাজীপাড়ার বাসা এবং ধানমন্ডির এফ-১, ২ গ্রিন কর্নার রোডের বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু তাকে গ্রেফতারে ব্যর্থ হয় দুদক টিম। এ ছাড়া মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেফতারের আওতায় আসবেন সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) এ মোনায়েম খান, উপব্যবস্থাপক এস এম জাহিদ, ডিএমডি কনককুমার পুরকায়স্থ, রিলেশন্সশিপ ম্যানেজার পলাশকুমার দাশগুপ্ত, এজিএম আবদুস সাত্তার খান, সাবেক জিএম মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, সাবেক এজিএম আবদুস সবুর, ডিজিএম কোরবান আলী, সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মঞ্জুর মোর্শেদ, সাবেক জিএম গোলাম ফারুক খান। এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংক মামলায় ডিএমডি ফজলুস সোবহান, মো. সেলিম, জিএম শিপার আহমেদ, জিএম জয়নাল আবেদীন চৌধুরী, ইকরামুল বারীকে গ্রেফতার করা হয়। ঋণগ্রহীতা হিসেবে ২৮ মার্চ গ্রেফতার করা হয় তিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিককে। সূত্র আরও জানান, বেসিক ব্যাংক ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের অর্ধশত এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন গ্রেফতারের তালিকায়। তবে দুদকের একটি সূত্র জানান, এসব আসামির কেউ কেউ ইতিমধ্যেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে রেখেছেন। জামিনের প্রমাণ দেখাতে না পারলে গ্রেফতার করা হবে


শেয়ার করুন