দিল্লিতে সহিংসতা রামুতে সম্প্রীতির মিলনমেলা

ইসলাম মাহমুদঃ
ভারতের দিল্লিতে এই মুহূর্তে যখন সহিংসতা চলছে ঠিক তখন কক্সবাজারের রামুতে একজন প্রয়াত বৌদ্ধ ভিক্ষুর অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এই মিলনমেলায় অংশ নিচ্ছেন অন্তত ১৮টি দেশের ৬০ জন ভিক্ষু। এছাড়া আওয়ামী লীগ, বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ সকল দলমতের মানুষের অংশগ্রহণে এ মিলনমেলা সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত বৌদ্ধ ভিক্ষু রামু সীমা মহবিহারের উপ-সংঘরাজ অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের গত ৪ অক্টোবর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ ১৪৮ দিন বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে সত্যপ্রিয় মহাথের’র মরদেহ পেটিকাবদ্ধ করে রামু সীমা বিহারে সংরক্ষণ করা হয়।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে সামনে রেখে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে রামুর মেরংলোয়া মাঠে ৪০ একর জায়গা জুড়ে বসেছিল সম্প্রীতির মেলা। মেলায় প্রতিদিন সার্কাস, মৃত্যুকূপ, ওয়াটাররেস, নাগরদোলাসহ শিশুদের বিভিন্ন বিনোদন এবং দেশি-বিদেশি পণ্যের দুই শতাধিক স্টলে শিশু, কিশোর, নারী, পুরুষ ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। এছাড়া ছিল সাংস্কৃতিক মঞ্চে প্রতিদিন মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় প্রয়াত পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র শবদেহ সহকারে শোভাযাত্রার মাধ্যমে তিন দিনের মূল অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়। রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার থেকে শুরু হওয়া বিশাল শোভাযাত্রা বিহার সংলগ্ন জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে শেষ হয়।

এতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঔশেসিং এমপি, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি, আশেক উল্লাহ রফিক এমপিসহ বিভিন্ন স্তরের দলীয় নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

অপরদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. সুকোমল বড়ুয়া, সাবেক সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজলসহ বিএনপির নেতৃবৃন্দ বৌদ্ধ ভিক্ষুর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেনসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ এতে অংশগ্রহণ করেন।

উপ-সংঘরাজ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উদযাপন পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী তরুণ বড়ুয়া জানান, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ ভিক্ষু ছাড়াও আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রতীম রাষ্ট্র থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ এতে অংশগ্রহণ করেন।

রামুর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ বলেন, কক্সবাজারের রামুর এই সম্প্রীতির বন্ধন এটি এখানকার শত বছরের ঐতিহ্য। ২০১২ সালের সেই দুঃখজনক ঘটনার ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়ালেও আমরা শত বছরের ঐতিহ্যের সম্প্রীতি ভুলে যায়নি।

কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক ছিলেন। তিনি মানবতার কাজ করেছেন, সম্প্রীতি স্থাপন করেছেন। তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সকল ধর্মের বর্ণের যে মিলনমেলা সৃষ্টি হয়েছে সেই সম্প্রীতি আমরা ধরে রাখতে চাই। এই সম্প্রীতির বন্ধন থেকে উপমহাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। বিশেষ করে তিনি ভারতকে এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সহকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিষ্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, আমি অবাক হয়ে গেছি এখানকার মানুষের সম্প্রীতি দেখে। অন্তেষ্টিক্রিয়ার এই পরিবেশ এটি শুধু কক্সবাজার নয় গোঠা উপমহাদেশের জন্য সম্প্রীতির রেকর্ড। এই মিলনমেলা দেখে আমি গর্বিত।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বলেছেন, অত্যন্ত নির্লোভ, নিরহংকারী ও সত্যনিষ্ট মানুষ ছিলেন বরেণ্য বৌদ্ধ গুরু একুশে পদকপ্রাপ্ত পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের। তাঁকে পেয়ে ধন্য হয়েছে বাংলাদেশ। পূর্ণ হয়েছে পূণ্যভূমি কক্সবাজার।

প্রয়াত এ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুর শবদেহ চন্দন কাঠের আগুনে পুড়িয়ে দাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে শনিবার।


শেয়ার করুন