চোরে চোরে মাসতুতো ভাই

2015_11_10_15_09_44_vfV3zzbMwHd24KMuEEKYu9KJflSShs_512xautoনিজস্ব প্রতিবেদক:
ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি পরবর্তীতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে ওই ভাষণে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। সেই ভাষণ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা কম হয়নি। সেসময় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই ওবামার এই বক্তব্যকে ঝুঁকিপূর্ণ, আবার কেউ একে সাধুবাদও জানিয়েছিলেন। সেই একই সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ওয়াশিংটনে রিপাবলিকানদের পক্ষ হয়ে ডেমোক্রেটদের বিরোধীতা করে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েছিলেন। তখন মনে করা হয়েছিল এবার বুঝি চিরতরে ভেঙ্গে গেল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক।

কিন্তু গত মঙ্গলবার যখন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে আসলেন, তখন কিন্তু ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। দুই নেতাই যেন চেষ্টা করছিলেন একে অপরকে কাছে টানতে। আর সেই কাছে টানার নমুনা হিসেবে তারা কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তির দিকেও নজর দেন। অথচ এমন একটি সময় এই অস্ত্র চুক্তি নিয়ে দুই নেতার আলোচনা হলো, যখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে প্রতিদিন নিরীহ ফিলিস্তিনিরা মারা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যারন মিলার বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নতি ছাড়া অবনতি দেখা যায়নি। ইরান বিষয়ক আলোচনা মোটামুটি শেষ হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের শান্তির আলাপটিও এড়িয়ে যাওয়া হলো পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে। আর এসময় কোনো অর্ন্তবর্তীকালীন পরিবর্তন হবে না এই দুই নেতার মধ্যে। কিন্তু ওবামা এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে বিরোধপূর্ণ আলোচনা হবার অনেকগুলো কারণ রয়েছে।’

ইসরায়েলে নিয়োজিত মার্কিন দূত ড্যান শাপিরোর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে পড়লে বিষয়টা কিছুটা পরিষ্কার হয়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বির্নিমানের প্রশ্নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। এটা চলতি সপ্তাহে চূড়ান্ত না হলেও, কিছু বিষয়ে যে ওই দুই নেতার সমঝোতা হয়েছে তা পরিষ্কার। কারণ এখনও ইসরায়েল বাৎসরিক যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের প্রনোদনা পেয়ে আসছে। যেহেতু ইরান ইস্যুতে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না, তাই এই দুই নেতা এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে যে, ইরান যেন হেজবুল্লাহ এবং হামাসকে সহায়তা না করতে পারে। পাশাপাশি এটাও ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব জলদিই ইসরায়েলের সঙ্গে সকল অস্ত্র সংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করে দিয়ে নতুন করে দশ বছরের চুক্তি করতে পারে।

আজ ইসরায়েল যে আয়রন ডোম মিসাইল ডিফেন্স নিয়ে ফিলিস্তনসহ বেশ কিছু আরব রাষ্ট্রকে ভয়ের মধ্যে রাখে, তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সহায়তায় পরিচালিত হয়। নতুন এই চুক্তি হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আয়রন ডোম প্রকল্পে আরও বিনিয়োগ করবে এবং কয়েক দফায় ইসরায়েলকে মোট ৩৩টি স্টিলথ এফ-৩৫ বিমান দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এবিষয়ে স্বাধীন এক বিশ্লেষক মার্ক সিরোইস বলেন, ‘নেতানিয়াহু খুব ভালো করেই জানেন যে গোটা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিভাবে দাড়িয়ে আছে। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চুক্তি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত দিক দিকে কিছু সুবিধা এনে দেবে। এখন নেতানিয়াহু যা করছে তা কেবলই অসন্তোষ কমাতে মৌনসম্মতি গ্রহন করছেন।’

গত সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি বাহিনী বিখ্যাত আল আকসা মসজিদে কোনো কারণ ছাড়াই হামলা চালায়। শুধু তাই নয়, টানা কয়েকদিন মসজিদটি অবরুদ্ধও করে রাখে তারা। পাশাপাশি পশ্চিম তীর এবং গাজায় এখনও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। এছাড়াও নিরীহ জনগণের উপর কাদুনে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড, রাবার বুলেট ছাড়াও মানুষ হত্যায় ব্যবহৃত গুলি ছুড়ছে তারা। অক্টোবর মাসের এক তারিখ থেকে চলতি দিন পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনার হাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮০জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। অথচ, আগস্ট মাসের আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলো ঘাটলেই দেখা যাবে, ইরানের সঙ্গে চুক্তির পর ওবামা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের জন্য নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন। এমনকি গত সপ্তাহেও যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বেন রোডস বলেছিলেন যে, এই দুইটি দেশের একত্রিক হবার কোনো পরিস্কার পথ এই মুহূর্তে নেই।

দ্য ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউটের বুদ্ধিজীবি নেরি জাবের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, ‘ওবামা কেন শুধুশুধু নেতানিয়াহুর সঙ্গে সংঘাতে যাবেন, যেখানে তাদের মধ্যে অদৃশ্যত কোনো মতানৈক্য নেই। আপনি যদি দীর্ঘ ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন, এই দুই দেশের সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক উষ্ণ এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভালো মিত্রও তারা।’ সাম্প্রতিক সফরে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন এবং দক্ষিণপন্থী ব্যবসায়িদের একটি সংস্থা থেকে পদকও গ্রহন করবেন। এই দলটিই আবার আমেরিকান প্রোগ্রেসের পক্ষে কথা বলে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু দেশে ফিরতে পারেন।


শেয়ার করুন