চাকরি হারানোর আতঙ্কে বিএসএমএমইউর দেড়শ চিকিৎসক!

02সিটিএন ডেস্ক:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ২০০ জন চিকিৎসকের নিয়োগ নিয়ে একটি রিট করার পর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল ৯ বছর আগেএসব চিকিৎসক। গত ২২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সেই রায় বহাল রাখায় আবার নুতন করে প্রায় দেড় শতাধিক চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তারা আতঙ্কিত এই ভেবে যে দীর্ঘদিন ধরে যে রিটটি তাদের দুর্ভাবনার সৃষ্টি করেছিল তা স্থায়ী হতে যাচ্ছে।

বিএসএমএমইউর প্রয়াত উপাচার্য ও বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) নেতা অধ্যাপক ডা. এমএ হাদীর আমলে ২০০৫ সালের ১৮ অক্টোবর অস্থায়ীভাবে ‘কিছু সংখ্যক’ চিকিৎসক নিয়োগের (মেডিকেল অফিসার পদ) জন্য একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। এর আলোকে ২০০ জনেরও বেশি চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু সে বছরই ‘কিছু সংখ্যক’ ও আরো কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সরকার সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান। রিটের শুনানিতে বলা হয়েছিল ২০০ জনের বেশি চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া যাবে না। এ অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে ২০০৬ সালের ২ মার্চ ২০০ চিকিৎসক কর্মস্থলে যোগ দেন। এ বছরের ২৭জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় এ নিয়োগ ও যোগদান অনুমোদিত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ তম সিন্ডিকেট সভায় ২০০ জনের চাকরি স্থায়ী করা হয়। এতে সিন্ডিকেট সদস্য এম ইকবাল আর্সলানও উপস্থিত ছিলেন, তখন তিনি এর বিরোধীতা করেননি।

২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর রিট আবেদনকারী এম ইকবাল আর্সলানের পক্ষে রায় দেয় হাই কোর্ট। যাতে বলা হয়েছিল এই নিয়োগ ও তার কার্যকারিতা অবৈধ।

এর ছয়দিনের প্রান্তে ২০০ চিকিৎসক এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ তৎকালীন চেম্বারজজ, বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা রায় স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তিনি হাইকোর্টের সেই রায় বহাল রাখেন। যার কবলে পড়ে গেছে বর্তমানে ১৪৩ জন চিকিৎসক। বাকিদের কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ বিদেশে আছেন, কেউবা এ চাকুরি ছেড়ে অন্যত্র আছে।

চিকিৎসকদের কয়েকজন নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, এই নিয়োগ যদি অবৈধ হয়, সেটার দায়ভায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এখানে তাদের কোনো দোষ নেই। এতোদিন চাকুরি করে অনেকের বয়স ৪১ থেকে ৪৫ এর উপরেও উঠে গেছে। এ অবস্থায় চাকুরিচ্যুতি ঘটলে অন্য কোথাও চাকুরি না হওয়ার জোর আশঙ্কা তাদের।

সূত্রে জানা গেছে, এসব চিকিৎসদের কেউ বড় ধরণের প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার নন, যার বলে চাকরি না থাকলেও প্রাকটিসের পয়সা দিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা ও তাদের পরিবার মহা-হতাশায় ডুবে আছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ১৪৩ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক আছেন। এর মধ্যে স্বাচিপের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক ডা. রাজিবুল আলমের স্ত্রী ডা. সম্প্রীতি ইসলাম। তিনি মেডিসিন বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে আছেন। বর্তমান ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেলের মেয়ে, চক্ষু বিভাগের মেডিকেল অফিসার স্বাচিপ নেতা ডা. শীষ মোহাম্মদ, আওয়ামী লীগ নেতা যিনি বীর ভাই নামেই সর্বাধিক পরিচিত, তার স্ত্রীও আছেন।

সূত্রে জানা গেছে, এসব চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকেই পোস্টগ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা। স্ব বেতনে সহযোগি অধ্যাপক একজন থাকার পাশাপাশি স্ব বেতনে বিভিন্ন বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে আছেন প্রায় ৮জনের মতো।

সূত্র দাবি করছে- এসব চিকিৎসক প্রায় ১০ বছর কাজ করে দক্ষতা অর্জন করেছে। তাদের বাদ দিলে বিম্ববিদ্যালয়ে সেবা গতি পিছিয়ে পড়বে। নতুন করে এতো চিকিৎসক তৈরি করতে লেগে যাবে আরও এক যুগ। তারা আশাবাদী- এখনও সুযোগ আছে, যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায়, তবে আইনিভাবেই চাকুরি রক্ষা সম্ভব।

একজন চিকিৎসক বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, কোর্ট বলেছিল ২০০জনের বেশি নেয়া যাবে না। সে অনুযায়ী নিয়োগ হয়, স্থায়ী করা হয় চাকুরি। তবে এখন কেন এমন করা হলো। আসলে আমরা বলির পাঠায় পরিণত হয়েছি। আমাদের নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে।

আপিল বিভাগ থেকে এখনও পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি আসেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। কপি পেলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব চিকিৎসকের নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। বর্তমানে চিকিৎসকরা কর্মস্থলেই আছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান আমাদের সময় ডটকমকে বলেন, সব কিছুই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নির্দেশে হচ্ছে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুই করার নেই। যারা বলছে, করার আছে, তারা না বুঝে বলছে। তারা তো ঠিকভাবে দায়িত্বই পালন করে না। তাদের রেখে লাভ কী।

রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পেলেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাচিপের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলানের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। শনিবার দুপুরে তার মোবাইল ফোনে কয়েকবার ডায়াল করে বন্ধ পাওয়া গেছে।


শেয়ার করুন