এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল আ.লীগের

2013-05-14-16-11-22-5192622a2076e-untitled-14-11সিটিএন ডেস্ক:
আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নতুন এই পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক থাকলেও পৃথিবীর বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশে দলীয় প্রতীকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়ে থাকে। তবে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি মারার রাজনৈতিক কৌশল হাতে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
প্রথমত, বিদ্রোহী প্রার্থী দমন করে একক দলীয় প্রার্থী চূড়ান্তের মাধ্যমে জয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার রাস্তা তৈরি করে দেওয়া। এর ফলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলেও অথবা না নিলেও রাজনৈতিক লাভ আওয়ামী লীগের কোর্টেই যাবে। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জানান, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে দলীয় প্রতীকে হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আক্ষরিক অর্থে দলীয়ভাবে হলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় নির্বাচন হতো। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনা করা হয়। এরপর আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরে মন্ত্রিসভায় এ-সংক্রান্ত সংশোধনী পাস হয়। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা আশা করছেন আগামী ডিসেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় পৌনে তিনশো পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে দলীয় প্রতীকে। ফলে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলীয় প্রতীক নৌকা, লাঙ্গল, ধানের শীষ নিয়ে অংশ নেবে।
ওই নেতারা জানান, এর আগে সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী সামলাতে হিমশিম খেতে হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল দলটির। এর ফলে অধিকাংশ স্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচনে জিতলেও অনেক উপজেলায় ভিন্ন দল সমর্থকরা বিজয়ী হয়। শুধু তাই নয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনায়ও সরকারি দলের নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। তাই এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা কমে আসবে। ফলে সহজেই তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে পারবে আওয়ামী লীগ।
এছাড়া বিএনপি, সিপিবিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসার আপত্তি দেখিয়েছিল দলগুলো। এখন ওই দলগুলোকে স্থানীয় নির্বাচনেও বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসতে হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাদের দলীয় প্রতীক কাস্তে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। দলটির দুয়েকজন নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেবে না। কিন্তু দলটির এখনো তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।
দলটির নেতারা ধারণা করছেন, চলতি সপ্তায় লন্ডনে খালেদা জিয়ার যে সমাবেশ হওয়ার কথা ওই সমাবেশ থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা আসতে পারে। বিএনপির নেতারা জানান, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় তারা বেশ বিপদে পড়েছেন। কারণ এই নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে আসতে হবে তাদের। আবার নির্বাচনে অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগের নেতারা খুব সহজে সরলীকরণ করতে পারবে যেÑ জোটসঙ্গী জামায়াত যুদ্ধাপরাধের দায়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না বলে বিএনপিও নির্বাচনে আসছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গতকাল বলেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দূরের কথা, এখনো কোনো বৈঠকই হয়নি। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়। তাই আমাদের ভাবতে হবে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে এই নির্বাচনে যাওয়া যাবে কিনা।
তিনি বলেন, আপনার কয়েকদিন আগে দেখলেন, তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ওটা কিন্তু দলীয় নির্বাচন ছিল না। তারপরও প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের যে আচরণ আমরা দেখলামÑ এরপর এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থাকারই কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তবে দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের প্রতীক নিয়ে অংশ নিয়েছে। কিন্তু দলটির দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে নির্বাচনে আসেনি। আসন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি যদি ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে রাজনৈতিকভাবে একধাপ এগিয়ে যাবে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে না আসে তাহলে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে আসতে পারছে না এই কারণে বিএনপি নির্বাচনে আসল নাÑ বিষয়টিও খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে।
তবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, বিএনপি নেতারা তো বলেছেই, আওয়ামী লীগকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেবে না। তিনি বলেন, আমার মনে হয় বিএনপি নেতারা বুঝতে পেরেছে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তাদের কী ক্ষতি হয়েছে। তাই তারা এখন বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেবে না। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি মনে করি খুব বেশি রাজনৈতিক লাভ হবে না আমাদের। কারণ এর আগে আওয়ামী লীগও তো নৌকা প্রতীক নিয়ে, বিএনপিও ধানের শীষ নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে বলে আমরা আশাবাদী। দেশের গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এরপরও যদি কোনো রাজনৈতিক নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে আমরা বুঝব গণতন্ত্রের প্রতি দলগুলোর নেতারা শ্রদ্ধাশীল নন।
একই বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায়নের একমাত্র উপায় হলো নির্বাচন। তাই জাতীয় অথবা স্থানীয় যেকোনো নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তই অরাজনৈতিক।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় পৌনে তিনশ পৌরসভায় চলতি বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচনের পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে পৌরসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানাভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। দৈনিক আমাদের সময়


শেয়ার করুন