বদলে যাচ্ছে ফেসবুক?


গত বছরটা ফেসবুকের জন্য বেশ খারাপ ছিল। একের পর এক কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত হয়েছিল মার্ক জাকারবার্গের তৈরি সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যম। চলতি বছরটা তাই ফেসবুকের ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। এবার তাই করতে চাচ্ছেন জাকারবার্গ। ফেসবুকের বেশ কিছু নীতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে কি বদলে যাচ্ছে ফেসবুক?

ফেসবুকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো ব্যবহারকারীদের তথ্য গোপনে হাতিয়ে নিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। এরপর নাকি সেই তথ্য বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে ব্যবসায়িক উদ্দেশে। গত কিছুদিনে বারবার উঠেছে এই অভিযোগ। প্রতিবারই ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে ফেসবুক। জাকারবার্গ তো ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি অস্বীকারও করতে পারেননি তিনি। কেন এত বিপুল পরিমাণ তথ্য নেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নের সদুত্তরও দিতে পারেননি ৩৪ বছর বয়সী জাকারবার্গ।

এসব অভিযোগের ভিড়ে স্বাভাবিকভাবেই ফেসবুকের প্রতি ব্যবহারকারীদের আস্থা কিছুটা কমে গেছে। আগে ব্যবহারকারীরা নিজের কোনো তথ্য ফেসবুককে দেওয়ার সময় দ্বিধায় ভুগতেন না। কিন্তু এখন সেই আস্থার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। মেসেঞ্জারের মতো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন যখন ইনস্টল হওয়ার সময় ব্যবহারকারীর বিভিন্ন তথ্যে প্রবেশাধিকার চায়, তখন একজন ব্যবহারকারীর ভ্রু কিছুটা কুঁচকে যায়। হয়তো ভাবেন, এসব তথ্য নিয়ে ফেসবুক বেচে দেবে না তো?

ফেসবুকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো—ব্যবহারকারীদের তথ্য গোপনে হাতিয়ে নিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। গত কিছুদিনে বারংবার উঠেছে এই অভিযোগ। প্রত্যেকবারই ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে ফেসবুক। ছবি: রয়টার্স
ফেসবুকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো—ব্যবহারকারীদের তথ্য গোপনে হাতিয়ে নিচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। গত কিছুদিনে বারংবার উঠেছে এই অভিযোগ। প্রত্যেকবারই ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে ফেসবুক। ছবি: রয়টার্স
ঠিক এই অনাস্থার জায়গায় আস্থা ফেরাতেই জাকারবার্গ ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার অধিকারকে প্রাধান্য দিতে চাইছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ফেসবুকের এফএইট ডেভেলপার কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই কনফারেন্সে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন মার্ক জাকারবার্গ। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তি জগতের ভবিষ্যৎ নিহিত আছে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার মধ্যে। কারণ, এখন বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীরা তাদের তথ্য ও বিভিন্ন বার্তা ‘প্রাইভেট’ রাখতে চান। এ কারণেই হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। দ্য ভার্জের খবরে বলা হয়েছে, এই জায়গাকেই আরও উন্নত করতে চাইছে ফেসবুক। জাকারবার্গ ভাবছেন, ফেসবুকের ব্যবসার ভবিষ্যৎও সেখানেই।

সেই ২০১৪ সালেই হোয়াটসঅ্যাপ-কে অধিগ্রহণ করেছে ফেসবুক। ইনস্টাগ্রামকেও নিজের ছায়ায় নিয়েছে জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ ব্যবসার ধরনে পরিবর্তন আনার ভাবনা হুট করে আসেনি। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ২০২০ সালের শুরুতেই আংশিকভাবে এক হয়ে যেতে পারে ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রাম। তখন আলাদা আলাদাভাবে অ্যাপ্লিকেশনগুলো চললেও, সব অ্যাপে প্রাইভেট মেসেজিং ফাংশন সমন্বিতভাবে চলবে। ফলে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী বার্তা পাঠাতে পারবেন একজন হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীকে। সে ক্ষেত্রে এই তিন অ্যাপের ব্যবহারকারীদের তথ্যও সমন্বিতভাবে একই সিস্টেমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে।

বর্তমানে শুধু হোয়াটসঅ্যাপে এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহার করা হয়। এই ফিচার থাকায় একজন ব্যবহারকারীর পাঠানো বার্তায় অনাকাঙ্ক্ষিত নজরদারি চালানো সম্ভব হয় না। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষও সেই বার্তার বিষয়বস্তু জানতে পারে না। সুরক্ষিত উপায়ে বার্তা আদানপ্রদানের সুবিধা থাকাকেই হোয়াটসঅ্যাপের জনপ্রিয়তার মূল কারণ বলে মনে করে থাকেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। এবার এই সুবিধাটিই চালু করতে চাইছে ফেসবুক। হোয়াটসঅ্যাপের মতো ফেসবুক মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামেও এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহার করতে চাইছেন জাকারবার্গ। তিনি মনে করছেন, এর মাধ্যমেই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করা সম্ভব হবে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, গুগল ও অ্যাপলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতেই ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামকে এক করার চেষ্টা করছেন জাকারবার্গ। অ্যাপলের আইমেসেজ অ্যাপ্লিকেশনকে টেক্কা দিতেই এই কাজ করতে চাইছে ফেসবুক। আইমেসেজ অ্যাপ্লিকেশনকে মেসেঞ্জারের মূল প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যম ওয়্যারড বলছে, বদলের এই যুগে বার্তা আদানপ্রদানের সঙ্গে সঙ্গে নিউজ ফিডেও পরিবর্তন আনতে চায় ফেসবুক। নিউজ ফিডে গুরুত্ব দেওয়া হবে বিভিন্ন গ্রুপকে। এসব গ্রুপের খবরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীভিত্তিক গ্রুপ তৈরির ব্যাপারেও উৎসাহ দেওয়া হবে।

তবে শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না ফেসবুক। টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু প্রাইভেট মেসেজিং নয়, বরং এই মাধ্যমে অর্থের আদানপ্রদান থেকে শুরু করে কেনাকাটার সুবিধাও চালু করতে চাইছে ফেসবুক। এর জন্য নিজেদের বিশেষ ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা তৈরির কাজ চালাচ্ছে জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান। তবে এই নতুন ডিজিটাল মুদ্রার মান বিটকয়েনের মতো দ্রুত ওঠানামা করবে না। বরং এই ক্রিপ্টোকারেন্সির মান অনেক স্থিতিশীল থাকবে। এরই মধ্যে ভারতের হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই সুবিধা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে।

চীনে চালু আছে বার্তা আদানপ্রদানের অ্যাপ ‘উইচ্যাট’। এই অ্যাপে বার্তা আদানপ্রদানের পাশাপাশি দোকান থেকে খাবার কেনা, অনলাইন ব্যাংকিং, অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া-নেওয়া, বিল পরিশোধ করাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া যায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, উইচ্যাটের মতো ফেসবুকেও একই ধরনের সুবিধা চালু করার কথা ভাবছেন জাকারবার্গ। সে ক্ষেত্রে এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়েই আয় বাড়াতে পারবে ফেসবুক, ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রির দরকার পড়বে না!

তবে এ ক্ষেত্রে বাধা আছে অনেক। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, প্রথম সমস্যাটি প্রযুক্তিগত। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হলে প্রায় ২৭০ কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রোগ্রামারদের ভিন্ন ভিন্ন অ্যাপের ভিন্ন ভিন্ন সোর্স কোড সমন্বয়ের কাজ করতে হবে। এটি বিশাল পরিসরের কাজ এবং কিছুটা অসম্ভবও। কথিত আছে, এই কাজ সম্ভব নয় বলেই ফেসবুক থেকে সরে গেছেন কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা।

দ্বিতীয় বাধাটি অর্থনৈতিক। চীনে উইচ্যাট যা করতে পেরেছে, ফেসবুকের তা করা অনেক কঠিন। কারণ চীনে উইচ্যাটের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপ নেই। কিন্তু ফেসবুকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছে গুগল ও অ্যাপলের মতো টেকজায়ান্টরা। সুতরাং ফেসবুকের সেই হিসাব নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

তৃতীয়ত, ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি রাখা। সাম্প্রতিক সময়ে এই ইস্যুতেই সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে ফেসবুক। মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে পারলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অসংখ্য ব্যবহারকারীর বিপুল তথ্য জমা হবে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের আরও বেশি তথ্য দিতে বাধ্য করাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ফেসবুক কীভাবে এই সুবিশাল তথ্যভান্ডার সুরক্ষিত রাখবে—সেটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আবার এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ফিচার চালু করলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষও ব্যবহারকারীদের বার্তার নাগাল পাবে না। সে ক্ষেত্রে কিছুটা নিরাপত্তা ঝুঁকিও সৃষ্টি হবে। কারণ এই সুবিধা ব্যবহারের চেষ্টা করবে সন্ত্রাসীরাও। তাই বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো এই ব্যবস্থাকে কতটুকু স্বাগত জানাবে, তা নিয়েও আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এই বিশাল কর্মপরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে মার্ক জাকারবার্গ বদ্ধপরিকর। ব্যবহারকারীদের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতিই সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। এর মধ্য দিয়ে আদতেই ফেসবুক লাভবান হবে কি না এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা উপকৃত হবেন কি না—সময়েই মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর।


শেয়ার করুন


একই রকম আরও কিছু পোস্ট