নির্বাচনী রাজনীতি

সংলাপ হয়েছে, এটাই অগ্রগতি

সিটিএন ডেস্ক 

গণভবনে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ইতিহাসের প্রথম জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও একটি বৈঠকেই বরফ গলার কথা ছিল না। তবে সংলাপে আমন্ত্রণের অর্থ দাঁড়ায়, সরকার সাত দফা দাবির মধ্যে অন্তত কিঞ্চিৎ হলেও ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। কিছুই ছাড় না দিয়ে সংলাপ যদি ‘অর্জন’ হয়, তাহলে সেটা কৌশলগত অর্জন। সরকারি দলের ‘উত্তাপে পানি ঢালার’ দাবি তা-ই নির্দেশ করে। এখন সরকার ছাড় দেবে, এটা একটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা। সেই জায়গাটি এখনো একদম অপূর্ণ রয়ে গেছে।

সরকারি দলের নেতারা ঘন ঘন এটা দাবি করতে অভ্যস্ত যে তাঁরা সংবিধানের বাইরে যাবেন না। কিন্তু ড. কামাল হোসেন সংবিধানের ভেতরে থেকে কীভাবে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের অদলবদল সম্ভব, তার রূপরেখা তুলে ধরেছেন, কিন্তু তার কোনো জবাব বা ব্যাখ্যা সরকারি দলের তরফে পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংলাপ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, ‘বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা হয় না।’ শুক্রবার বেইলি রোডের বাসভবনে আমরা কথা বলি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে। তাঁর যুক্তি এ রকম: ‘বাহাত্তর সালে ব্রিটিশ রীতিনীতি অনুসরণ করেই সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়াসহ কমনওয়েলথভুক্ত অন্তত ১০টি দেশে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা হয়। ব্রিটেনের ২০১১ সালে প্রণীত ফিক্সড পার্লামেন্ট আইনে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নির্বাচন করার মধ্যে ২৫ দিনের ব্যবধান রাখার শর্ত রাখা হয়েছে। আমাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ে এই ব্যবধান ৪২ দিন রাখার একটি নির্দেশনা আছে।’ ২০১৪ সালের নির্বাচনটি বাদে বাংলাদেশের বাকি সব সাধারণ নির্বাচন সংসদ ভেঙে দিয়ে করা হয়েছে। ভারতের ১৪টি নির্বাচনে (১৯৫২-২০১৪) সাতটি সংসদ রেখে আর সাতটি ভেঙে হয়েছে। নাইজেরিয়াও সংসদ রেখে নির্বাচন করে।

সংলাপে স্পষ্টতই ড. কামাল হোসেনের উদ্দেশে সরকারপ্রধানের বক্তৃতায় দুটি প্রসঙ্গ এসেছে। প্রথমত, ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে বাহাত্তরের সংবিধান মানে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন করার বিধান আনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ‘আপনিও (ড. কামাল) তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হয়েছেন। তাহলে এখন বিরোধিতা কেন।’ কামাল হোসেন মনে করেন, ‘প্রয়োজনে সংশোধনী আনা প্রত্যেক জাতির
ইতিহাসে আছে।’ ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন করার যে বিধান ছিল, তা বাহাত্তরের সংবিধানেরই অনুরূপ ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দাবির মুখে মেয়াদ পূর্তির ১৩৩ দিন আগে পঞ্চম সংসদ ভেঙে দেন খালেদা জিয়া। আর ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে মিরপুর-মোহাম্মদপুর থেকে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসনে কামাল হোসেন এক অতুলনীয় পরিস্থিতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৩ সালের
প্রথম সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে তিনি শাজাহান সিরাজকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে জয়ী হয়েছিলেন।

এ বিষয়ে সংলাপে কামাল হোসেন আর বিতর্কে যাননি। কারণ, তিনি সম্ভবত আগেই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে কোনো পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তিনি দেবেন না। তবে পাল্টাপাল্টি কথা না বলার এই মনোভাব দুই বড় দলও প্রশংসনীয়ভাবে বজায় রেখেছে। পুনরায় সংলাপে বসতে দুই পক্ষই আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। কিন্তু বাস্তবে নির্দলীয় সরকার গঠন বা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের তো কোনো প্রশ্নই নেই, এমনকি সংসদ ভেঙে দেওয়া বা নির্বাচনকালীন সরকারে দু-একটি মন্ত্রণালয় সরকারের হাতে না রাখার মতো কোনো প্রস্তাব যে সরকার বিবেচনা করবে, তারও সামান্য আভাস নেই। সুতরাং হতাশা কাটেনি। ঐক্যফ্রন্ট চাইলে নির্বাচনের আগে দ্বিতীয় বৈঠক হতে পারে, কিন্তু মাঠ সমতল করা-সংক্রান্ত মূল দাবিগুলোর সবটাই অধরা থেকে যেতে পারে। অবশ্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার বিষয়ে ড. কামাল হোসেন যখন অত্যন্ত সৌজন্যমূলক উক্তি করেছেন, তার উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ওপরেই আস্থা রাখতে বলেছেন। ড. কামাল বলেছিলেন, অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাঁর পুনঃপ্রত্যাবর্তন দেখতে পেলে তিনি খুশিই হবেন।

আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী চাইলে নির্বাচনে রাষ্ট্রযন্ত্রের সংকীর্ণ প্রয়োগ কার্যকরভাবে রহিত করতে পারেন। পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। কারণ, বাহাত্তরের সংবিধান তাঁকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়েছে। সংলাপের আরেকটি স্পর্শকাতর দিক ছিল আগামী নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি। জমির উদ্দিন সরকার দণ্ডিত হওয়ার পরেও মামলা তুলে নেওয়ার আইনি পথ খোলা থাকার যুক্তি দেন, যার উত্তর এড়িয়ে গেছে সরকারি দল। আর শুনেছি, তারেক রহমানের নাম শুধু একবার মির্জা ফখরুল ইসলামই উল্লেখ করেছেন। সরকারি দল কিছু বলেনি।

কেবল দুটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে ‘প্রাথমিক আংশিক অর্জন’ দেখছেন ড. কামাল হোসেন—গায়েবি মামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তালিকা চাওয়া এবং সভা-সমাবেশের অধিকারে বাধা না দিতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি। প্রধানমন্ত্রীর মুখে সমাবেশের অধিকার দেওয়ার কথা শোনামাত্র কামাল হোসেন বলেছেন, আমি কি জনগণকে এটা জানাতে পারি যে আপনি এ বিষয়ে আমাদের নিশ্চয়তা দিয়েছেন? উত্তরে প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হাঁ-সূচক মন্তব্য করেছেন। সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দল সংখ্যায় অনেক বেশি সমাবেশ করবে, সেটাই ছিল আমাদের ঐতিহ্য। এখন এর পশ্চাৎমুখী যাত্রা চলছে।

এই সংলাপের অন্তত ৫টি দিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এক. বিদেশি দূতাবাসগুলোর দৃশ্যমান কোনোরূপ দৌড়ঝাঁপ, দূতিয়ালি কিংবা হরতাল-ভাঙচুর অবরোধ না থাকা একটি পরিবেশে সেতুমন্ত্রীর ভাষায় যথার্থই ‘খোলামেলা’ সংলাপ হয়েছে। দুই. এই বৈঠক ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার একটি ভালো উদাহরণ তৈরি করেছে। সাড়ে তিন ঘণ্টার আলোচনায় ঐক্যফ্রন্টের ১২ জনের বক্তৃতা করার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬ জন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করেছেন, যাতে সভার প্রধান আলোচ্যসূচি সাত দফার বাইরের বিষয়েরই প্রাধান্য ছিল। তবে ১৮ জনের বক্তৃতা, এর মধ্যে কেউ কেউ দু-তিনবারও কথা বলার সুযোগ নিয়েছেন। কিন্তু এর মধ্যে পরস্পরকে থামিয়ে দেওয়া, কথার মধ্যে কথা শুরু করা কিংবা বাধাদান চেষ্টার একটি ঘটনাও ঘটেনি। এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের ইঙ্গিতবহ। তিন. সাধারণত সরকারের উদ্যোগেই রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। চার. বিরোধী দলের প্রতি যুদ্ধংদেহী মনোভাব গণভবনের সংলাপে ছিল না। এমনকি জামায়াতের সঙ্গে সখ্য নিয়ে কোনো চিরচেনা খোঁচা ছিল না। প্রত্যেকের বাক্‌সংযম ও পরিমিতিবোধ ছিল লক্ষণীয়ভাবে আলাদা। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর বক্তৃতায় একটু উচ্চ স্বরে বিএনপির উদ্দেশে ‘আগুন-সন্ত্রাসের’ প্রসঙ্গে ঝাঁজ মেশাতে চাইলে তিনি সরকারি দল থেকেই বাধা পান। তথ্যমন্ত্রীও তাৎক্ষণিক দুঃখ প্রকাশ করেন। পাঁচ. সংলাপ শুরুর প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করা যে অসম্ভব নয়, তারও নজির তৈরি হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা মনে করেন, সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় তাড়াহুড়ো করছে। তাই ঝুঁকি আরও না বাড়িয়ে তাঁরা চিঠি দেন। এটাও বিবেচনায় নেওয়া হয় যে সংবিধানের ১২৩(৩)ক উপদফার আওতায় একাদশ সংসদ নির্বাচনটি ২৮ অক্টোবরের পরের ৯০ দিনের মধ্যে করে ফেলা সম্ভব।

২ নভেম্বর অপরাহ্ণে ড. কামাল হোসেনকে বিএনপির মহাসচিব জানিয়েছেন, ‘তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে সাড়া দিয়ে গায়েবি মামলার একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রীকে দিতে চান।’ এই তালিকা হস্তান্তর করলে তা সংলাপ চলমান রাখার অংশ হতে পারে। ড. কামাল হোসেন কার্যকর আলাপ-আলোচনা বা উভয় তরফে একটি সংযোগ রক্ষা করতে কমিটি গঠনের প্রস্তাব চিন্তাভাবনা করছেন। ছোট পরিসরে সংলাপের ধারণা এগিয়ে নেওয়া যায়। সরকারের তাতে সমর্থনও দেখা যাচ্ছে।

ড. কামাল মনে করেন, তাঁর বলা ‘ভালো আলোচনা’ এবং বিএনপির মহাসচিবের কথায় ‘সন্তুষ্ট নই’-এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ, অন্তরঙ্গ পরিবেশ বিবেচনায় তিনি ভালো আলোচনা বলেছেন। আর সরকার যেহেতু উল্লেখযোগ্য একটি দাবিও নির্দিষ্টভাবে মেনে নেয়নি, তাই তা সন্তোষজনক নয়। নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে গেলেও, তিনি মূলত শেখ হাসিনাকে নেলসন ম্যান্ডেলার মতো ভূমিকা রাখতেই অনুরোধ করেন। ‘জাতীয় মেলবন্ধনে’ অবদান রেখে ‘ইতিহাসে সোনার হরফে’ নাম লেখানোর কথাও বলেন। প্রধানমন্ত্রী এর উত্তর দেননি। তবে তিনি বিষয়গুলো ভাববেন, সেই আশা করব।

আরও আশা করব, বিএনপি নির্বাচন প্রশ্নে যে সিদ্ধান্তই নিক, এই সংলাপের একটা ধারা সব অবস্থায় চলমান থাকুক।


শেয়ার করুন


একই রকম আরও কিছু পোস্ট