বিশেষ নিবন্ধ

মে দিবসে একটি আবেদন

5fd28439a07b1436902e50dc48b312fa-5906403b15d23

কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ৩৪তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো ঢাকায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ থেকে তাদের পার্লামেন্টের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার প্রমুখ এসেছিলেন বাংলাদেশে। তাঁদের সফরসঙ্গী হয়ে এসেছিলেন আরও অতিথি। দেশের অন্য কোনো জায়গায় যদি তাঁরা নাও গিয়ে থাকেন, রাজধানী নগরী ঘুরে দেখার সুযোগ তাঁরা পেয়েছেন। অবশ্য ঠিক সেই সময়ই জঙ্গি নিয়ে এমন সব খবরাখবর প্রকাশিত হতে থাকে যে তা পত্রপত্রিকায় পাঠ করে এবং টেলিভিশনের পর্দায় দেখে অনেকেই প্রয়োজনের বাইরে সীমিত স্থানে ঘোরাঘুরি করেছেন। অনেকে তাঁদের হোটেলের কক্ষের বাইরে যথাসম্ভব বের হননি নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে পৃথিবীর মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে সমাজে তার দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিফলন ঘটে। যেমন ৪০-৫০ বছর আগে রাস্তায় বেরোলে দেখা যেত মানুষের গায়ে ভালো জামাকাপড় নেই। অনেকের পায়ে জুতা-স্যান্ডেল নেই। দারিদ্র্যের প্রকাশ লক্ষ করা যেত মানুষের চোখেমুখে। এখন আর সে অবস্থাটি নেই। খাদ্যের অভাবে রাস্তায় পড়ে রয়েছে এমন মানুষ আজ খুব কমই চোখে পড়ে।

আইপিইউ সম্মেলনের সময় আমি কোনো প্রয়োজনে গুলশান এলাকায় গিয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে মেরামত বা পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। গুলশান, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকা। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের রাষ্ট্রদূতদের বাসভবন অথবা দূতাবাসের সামনের সড়কে দেখলাম একদল নারী শ্রমিকের কেউ কোদাল দিয়ে মাটি কাটছে, কেউ টুকরিতে করে মাথায় নিয়ে সেই মাটি বহন করে কোথাও নিয়ে ফেলছে। আমি গুনে দেখলাম সংখ্যায় তারা ১৭ জন। তখন চৈত্রের প্রখর রোদ। গাছতলায় ছায়ায় দাঁড়িয়ে তাদের কাজ তদারক করছে ঠিকাদারের দুজন লোক।

এই দৃশ্য যে আমি শুধু ওই দিনই দেখেছি তা নয়। ধানমন্ডি, গুলশান এলাকায় হামেশাই দেখা যায়। বাংলার নারী রাস্তায় কোদাল দিয়ে মাটি কাটবে এবং ঝুড়িতে মাথায় নিয়ে তা বহন করবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সেদিন গুলশানে নারী শ্রমিকদের রাস্তায় কাজ করতে দেখে বিপন্ন, ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হই একটি কারণে। তাদের মাটি কাটার দৃশ্য কয়েকজন উৎসুক বিদেশি নারী ও পুরুষ তাঁদের ক্যামেরায় ধারণ করছিলেন।

যে ১৭ জন হতদরিদ্র নারী কোদালে মাটি কাটছে ও মাথায় বহন করছে তাদের বস্ত্র এতটাই জীর্ণ যে তাকানো যায় না। বয়সে তারা ষোলো–সতেরো থেকে পঞ্চাশের মতো হবে। যদিও অভাবী মানুষকে দেখে বয়স বোঝা যায় না। অপুষ্টির ফলে তাদের শরীরে হাড় ও চামড়া ছাড়া আর কিছু নেই। তাদের মধ্যে এক নারী সন্তানসম্ভবা। দেখে মনে হলো সন্তান প্রসবের আর খুব বেশি দেরি নেই। তার মাথায়ও একটা ন্যাকড়ার বিড়া দিয়ে মাটিভর্তি ভারী টুকরি।

আমি গাড়ি থেকে নেমে বাঙালি নারী শ্রমিকের মাটি কাটার দৃশ্য ও বিদেশি নারীদের তা ভিডিও করার কাজটি দেখলাম। আমি বিদেশিদের ভিডিও করায় বাধা দিতে চেয়েও দিতে পারিনি। কারণ, তাতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেত, আলোচিত হতো। ফলে যে দৃশ্যটি নিয়ে আমার বেদনা তা আরও বেশি করে প্রচার পেত। কিন্তু বিদেশিদের ছবি তুলতে বারণ করতে না পারায় আরও বেশি অন্তর্জ্বালায় জ্বলতে থাকি।

যখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে, সেই সময় নারীদের কোদালে মাটি কাটা ও সে মাটি মাথায় করে বহন করার দৃশ্য একেবারেই বেমানান। আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে তা মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়।

প্রায়ই দেখা যায়, ভবন নির্মাণ বা রাস্তাঘাট মেরামতের কাজে সড়কের পাশে বসে রোদ-বৃষ্টিতে নারীরা ইট ভাঙছে। পত্রিকায় ছবি দেখেছি কোলের সন্তান বুকের দুধ পান করছে আর মা ইট ভাঙছে। তবু সে কাজ বসে বসে করে। পরিশ্রম অপেক্ষাকৃত কম। যাঁরা মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন, তাঁরা দেখতে পান ফসলের উর্বর জমি নষ্ট করে গড়ে ওঠা ইটের ভাটায় মেয়েরা কাজ করছে। মাথায় মাটি বইছে। সেটাও অতি কঠোর কায়িক শ্রমের কাজ।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষ খারাপ তা বলা যাবে না। সেই অর্থনীতিতে নারীর অবদান অপরিমেয়। ২০১৫-তে একটি বিখ্যাত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এক জরিপে দেখিয়েছে, নারীরা প্রতিদিন তাদের বাড়িতে ৪৫-৪৬ রকমের কাজ করে থাকে। গড়ে একজন নারী ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করে থাকে। পরিবারের কাজের ৮০ শতাংশের বেশি শ্রম নারীর। বাংলাদেশের নারীদের কাজের মূল্য হিসাব করে বলা হয়েছে, তার পরিমাণ বছরে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে হাজার হাজার বছর ধরে নারীরা যে বিশাল অবদান রেখে আসছে তার কোনো স্বীকৃতি ছিল না। এখন গৃহস্থালির কাজ এবং কৃষিকাজের বাইরে তারা আধুনিক কলকারখানায় কাজ করায় তাদের কাজের স্বীকৃতি না দিয়ে উপায় নেই। পোশাকশিল্পে কাজ করে নারীরা জাতীয় অর্থনীতিতে অপরিমেয় অবদান রাখছে, তা আজ বিশ্বে স্বীকৃত। সেখানেও তাদের কাজের পরিবেশ অধিকাংশ জায়গায় সন্তোষজনক নয়। তবু পোশাকশিল্পের কাজটা ঘরের মধ্যে। অন্তত রোদ-বৃষ্টি থেকে রেহাই পাওয়া যায়। সড়কপথে যাঁরা উত্তরবঙ্গে যাতায়াত করেন তাঁরা দেখতে পান ধানের চাতালে নারীরা কাজ করছে। চালকলের জন্য চাতালে রোদের মধ্যে ধান শুকানোর কাজ যথেষ্ট পরিশ্রমের।

পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ নারীসমাজে বিপ্লব ঘটে গেছে। কিন্তু সেখানে তাদের জীবন যে নিরাপদ তা নয়। কর্মস্থলে যাতায়াতে নিরাপত্তার অভাব। যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া ছাড়াও কর্মস্থলেও জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নারীই সবচেয়ে বিপন্ন। গত কয়েক বছরে বড় বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডে নারী শ্রমিকই মারা গেছে বেশি। রানা প্লাজা ধসে এক দিনেই শত শত নারী জীবন হারায়।

বাংলাদেশে এখন ষাটের দশকের মতো কোনো প্রগতিশীল শ্রমিক আন্দোলন নেই। তবে শ্রমিক সংগঠনের নেতারা খুবই ভাগ্যবান। তাঁরা সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বিদেশ সফর করেন। মালিকদের সঙ্গে অথবা মালিকের টাকায় পবিত্র হজ পালন এবং ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ করেন। কলকারখানার শ্রমিকদের অধিকার আদায়েও তাঁদের কিছু কাজ করতেই হয়। কিন্তু নারী শ্রমিকদের, বিশেষ করে অপ্রথাগত নারী শ্রমিকদের ব্যাপারে তাঁদের ভূমিকা নেই। শুধু শ্রমিক সংগঠন নয়, মধ্যবিত্ত নারী সংগঠনগুলোর ভূমিকাও চোখে পড়ে না। যে কারণে অভিজাত এলাকাগুলোতে সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের চোখের সামনে যখন নারী কোদালে মাটি কাটে এবং মাথায় টুকরিতে মাটি বহন করে, তা দেখে তঁারা গ্লানি বা বেদনাবোধ করেন না।

নারীর ক্ষমতায়ন যেমন জরুরি, মানুষ হিসেবে নারীর মর্যাদা রক্ষা আরও বেশি জরুরি। সারল্যবশত কোনো প্রগতিশীল হয়তো বলবেন, নারী ও পুরুষ সমান অধিকার দাবি করলে পুরুষ যদি কোদালে মাটি কেটে টুকরিতে করে বহন করতে পারে, নারী পারবে না কেন? এবং তা করলে আপত্তি কোথায়? তাঁরা বলবেন, নারীর তো শারীরিক ক্ষমতাও পুরুষের চেয়ে কম নয়। আমাদের মেয়েরা এখন ফুটবল ও ক্রিকেট পর্যন্ত খেলে সুনাম করছে। এই যুক্তির পরে বলার শুধু এইটুকু আছে যে একজন পুরুষকে আট-নয় মাস গর্ভে সন্তান ধারণ করতে হয় না। জন্মের পর সন্তানকে বছরখানেক বুকের দুধ খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয় না।

যে নারী কোদালে মাটি কেটে তা টুকরিতে করে মাথায় বহন করছে, সে তা করছে পেটের দায়ে। তা ছাড়া নারী শ্রমিককে ঠিকাদারদের পছন্দ আর একটি কারণে। তাদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কম। আমি একজন নারী শ্রমিককে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মজুরি তিন ভাগের দুই ভাগ, অথচ কাজ প্রায় সমান।

গত কয়েক বছরে রাজধানীর বনানী, গুলশান, বারিধারা এলাকায় মেয়েদের মাটি কাটতে দেখে আমি কয়েকজন ঠিকাদারকে অনুরোধ করেছি অন্তত এই কাজটি তাদের দিয়ে না করাতে। তাঁরা আমাদের মতো একজন নাগরিকের অনুরোধ শুনতে বাধ্য নন। কিন্তু কাজটি আমার কাছে বোধ হয়েছে অমানবিক ও দৃষ্টিকটু। তাই মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে অনুরোধ করি, আইন করে হোক, অধ্যাদেশ জারি করে হোক বা প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন জারি করে হোক, নারীদের দিয়ে মাটি কাটা ও মাটি বহনের কাজটি নিষিদ্ধের ব্যবস্থা করুন। একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতির নেতা হিসেবে একজন সাধারণ নাগরিকের এই আবেদন তাঁরা বিবেচনা করবেন, এবারের মে দিবসে এই প্রত্যাশা করি।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।


শেয়ার করুন


একই রকম আরও কিছু পোস্ট