দিন বদলের বারতা নিয়ে এলো নববর্ষ

172552_1
ঢাকা: রাত পোহালেই বাংলা নববর্ষ। পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হবে নতুন বছর ১৪২৪। স্বাগত বাংলা নববর্ষ।

পুরোনো সব গ্লানি মুছে নতুনের আগমনী বার্তা জানান দিতেই যেন বারে বারে নতুন করে, নতুন রঙে ফিরে আসে বাংলা নববর্ষ।

বাংলা নববর্ষ ১৪২৪ বরণ করে নিতে চলছে নানা উৎসবের আয়োজন। এই দিনে সবার প্রত্যাশা নতুন বছরটি হবে সুখ-ছন্দের, প্রতিটি দিন কাটবে আনন্দ- হিল্লোলে।

বর্ষবরণ উপলক্ষে এবার নেয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা। উৎসব পালনে আরোপ করা হয়েছে কিছু বিধিনিষেধ।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারাদেশ। গ্রীষ্মের খরতাপ উপেক্ষা করে বাঙালি মিলিত হবে তার সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবে। দেশের পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসব মুখরতার বিহ্বলতা।

বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনো এদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির আরো বিস্তার ঘটিয়েছে। কৃষক সমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। এককালে কেবল গ্রামাঞ্চলেই পয়লা বৈশাখের উৎসবে মেতে উঠতো মানুষ। নানা অনুষ্ঠান, মেলা আর হালখাতা খোলার মাধ্যমে তখন করানো হতো মিষ্টিমুখ।

এখন আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরো বেশি উজ্জ্বলতায়।
নববর্ষ উপলক্ষে দিনটি সরকারি ছুটির দিন।

বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র্যা বের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা।

সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেক পোস্ট। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।

মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) তার রাজসভার জ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে একটা সার্বজনীন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সৌরমাসভিত্তিক একটা ফসলি সাল উদ্ভাবন করেন। সম্রাট আকবরের দিল্লির সিংহাসনে আরোহনের দিনকে স্মরণীয় রাখতে ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ ধরে সাল গণনা করার রীতি প্রবর্তন করা হয়।

সম্রাট আকবর তার রাজত্বকালে ভারত উপমহাদেশের সর্বত্র এই ফসলি সনের শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে এই ফসলি সনের নামই বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ হয়েছে।

বাংলা সন সবসময়ই কৃষিভিত্তিক। আজও আমাদের কৃষকসমাজ বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করেই হাল চালান, ফসল ফলান। ফসলি সনের সঙ্গে কৃষকের আত্মার সম্পর্ক।

মাঠের শ্রম যখন ফসল হয়ে ঘরের আঙ্গিনায় উঠে, আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন পূরণে আশাবাদ জাগে তখন উৎসবের আমেজ পাওয়া যায়। আগে উৎসবগুলো ঘিরে গ্রামে গ্রামে গ্রামীণ সংস্কৃতির যে সকল আসর বসত মেলা তার অন্যতম।

এ সকল উৎসবে আনন্দে মেতে থাকত গ্রামের মানুষ। মেলায় মানুষের ঢল নামত। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে হৈচৈ করে বেড়াত আবাল বৃদ্ধ বণিতা। মেলাকে ঘিরে হস্তশিল্পের নহর বয়ে যেত। কৃষক তার সারাবছরের ঘর-গৃহস্থালির সরঞ্জাম এখান থেকেই সংগ্রহ করতেন।

সেই কৃষ্টি-কালচার-উৎসব গ্রামে হারিয়ে যেতে বসেছে। তার পরিবর্তে শহুরে উৎসবে উৎসাহ বেড়েছে কয়েকগুণ। গ্রামের আনাচে-কানাচে কে আর পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায়।

মাটির সানকিতে একদিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে গ্রাম-বাংলার সেই সুখস্মৃতি কি কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে?

বাংলা নববর্ষ উদযাপনে এখন নানা ধরনের বর্ণিল আয়োজন হতে দেখা যায়। তবে আজও মঙ্গল শোভাযাত্রা রয়েছে এর সর্বাগ্রে।

বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠানসমূহ:
বর্ষবরণে দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থাৎ ভোর ছটা দশ মিনিটে সরোদবাদন দিয়ে শুরু করবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। রমনায় ছায়ানটের অনুষ্ঠানের অর্ধ শতাব্দী পূরণ উপলক্ষে এবারের আয়োজন হবে বড় ও তিন পর্বে বিভক্ত। বেলা দশটা নাগাদ অনুষ্ঠান শেষ হবে দেওয়ানা মদিনা লোকপালা দিয়ে।

চারুকলার শিক্ষার্থীরা সকাল নয়টায় বের করবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য করা হয়েছে-‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর…।’

ইউনেস্কো বর্ষবরণের এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়ায় চারুকলা অনুষদ বিগত ২৮ বছরের উল্লেখযোগ্য মোটিফগুলো এবারের শোভাযাত্রায় রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

বাঙালির প্রাণের এ উৎসব উদযাপনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠনও বর্ণাঢ্য কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের উদ্যোগে কলাভবন বটতলায় শুক্রবার সকাল ৮টায় সংগীতানুষ্ঠান শুরু হবে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট পয়লা বৈশাখের দিন বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিরপুর, দনিয়া রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে একক ও দলীয় লোকসঙ্গীত, নৃত্য ও আবৃত্তিসহ নানা আয়োজন পরিবেশন করবে।

বাংলা একাডেমি সকাল সাড়ে ৭টায় একাডেমির রবীন্দ্র-চত্বরে বর্ষবরণ উপলক্ষে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে একাডেমি ‘বইয়ের আড়ং’ শিরোনামে পহেলা বৈশাখ থেকে ১০ বৈশাখ পর্যন্ত বইমেলার আয়োজন রেখেছে। এছাড়া ১০ দিনব্যাপি বৈশাখী মেলার আয়োজনও আছে একাডেমি চত্বরে।

শুক্রবার বিকেল ৪টায় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার উদ্বোধন করবেন। বাংলাদেশ কুটির শিল্প কর্পোরেশন এবং বাংলা একাডেমি যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করবে।

বাংলা নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি শনিবার বিকেল ৫টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজন করেছে বিশেষ নাট্যানুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানে লালন ফকিরের জীবন ও দর্শন নির্ভর নাটক ‘ম্যান অব দ্য হার্ট’ পরিবেশিত হবে।


শেয়ার করুন


একই রকম আরও কিছু পোস্ট