আগামী নির্বাচনে যন্ত্র দিয়ে ভোট?

বিভিন্ন দেশে যন্ত্রে ভোট নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ আছে, চেষ্টা করা সত্ত্বেও যন্ত্রে ভোট সম্পূর্ণ নিরাপদ করা যায়নি। তাই এটি খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কেবল যন্ত্রের ব্যবহার রাখলে চলবে না। কাগজের ব্যবহার থাকতে হবে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে চায় নির্বাচন কমিশন। কাগুজে ব্যালটের পরিবর্তে যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। যন্ত্র তৈরির কাজও অনেকটা এগিয়েছে। যন্ত্রটির সম্ভাব্য নাম ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম)। বাংলাদেশে কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ছোট আকারে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমের নতুন রূপই হলো ডিভিএম।

তবে এই পদ্ধতি নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অবস্থান দুই দিকে। আওয়ামী লীগ ই-ভোটিংয়ের পক্ষে থাকলেও বিএনপি এটিকে দেখছে কারচুপির যন্ত্র হিসেবে। গত ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগ যন্ত্রে ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানিয়েছিল। গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং চালু করার পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
তবে এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, এটি দুরভিসন্ধিমূলক। নির্বাচনে কারসাজি করতে ভোট গ্রহণে যন্ত্রের ব্যবহার সরকারের একটি নতুন চাল। নিরক্ষর মানুষের ভোট নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার এটি করতে চাইছে।
আগের শামসুল হুদা কমিশন ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। আর সদ্য বিদায়ী রকিব কমিশন ডিভিএম পদ্ধতির কথা বলেছিল। তবে দুটি প্রায় একই। ডিভিএম পদ্ধতিতে কী কী সুবিধা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কমিটির একজন বিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, ইভিএমে যে কেউ যে কারও ভোট দিতে পারতেন। ধরার উপায় ছিল না। কিন্তু ডিভিএমে সেই সুযোগ থাকবে না। এখানে বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) পদ্ধতিতে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। প্রথমে একজন ভোটার ওই যন্ত্রে আঙুলের ছাপ দেবেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ডেটাবেইসের সঙ্গে ভোটারের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। আঙুলের ছাপ মিললে ভোটার ভোট দিতে পারবেন। ওই ভোটার একটি ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যন্ত্রটি বন্ধ (লক) হয়ে যাবে। এরপর ওই ভোটার আর কোনোভাবেই আরেকটি ভোট দিতে পারবেন না। তা ছাড়া ডিভিএমে স্মার্ট কার্ড প্রবেশ করিয়েও ভোটারের পরিচয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
নির্ধারিত ভোটার ভোটকেন্দ্রে না গেলে বা কেন্দ্র দখল করে কোনো ভোটারের ভোট অন্য কারও পক্ষে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ভোট গ্রহণের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বা বাক্সে ফেলার কোনো উপায় থাকবে না। এ ছাড়া আরেকটি সুবিধা হলো, আগের প্রস্তাবিত ইভিএম মেশিনের কারিগরি ত্রুটির কারণে ভোটের তথ্য মুছে যেত। কিন্তু ডিভিএমে এই সুযোগ থাকছে না। এখানে মেশিনের কারিগরি ত্রুটি হলেও এর সর্বশেষ তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটা হবে অনেকটা উড়োজাহাজের ‘ব্ল্যাকবক্স’-এর মতো। মেশিনের যত সমস্যাই হোক, সব তথ্য এখানে সংরক্ষণ করা হবে। মেশিন বিদ্যুতে চলবে। তবে ব্যাকআপ হিসেবে ব্যাটারিও থাকবে। যেসব স্থানে বিদ্যুৎ নেই, সেখানে ব্যাটারিতে চলবে।
২০১৬ সালের ২৫ জুলাই নির্বাচন কমিশনের এক বৈঠকে যন্ত্রে ভোট নেওয়ার নতুন প্রযুক্তি ডিভিএম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়ন ও বিতরণ অনু বিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহউদ্দিন। এরপর সদ্য বিদায়ী কমিশন গত বছরের অক্টোবরে ১৯ জন প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে। ডিভিএম কেমন হবে, আগের ইভিএমের তুলনায় ডিভিএমে কতটা বেশি সুবিধা থাকবে, ভোট গ্রহণ প্রশ্নহীন হবে কি না, সে ব্যাপারে মতামত দেবে কমিটি। কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। কমিটির মতামত ইতিবাচক হলে চলতি বছরই পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হতে পারে।
জানতে চাইলে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যন্ত্রে ভোট নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ আছে, চেষ্টা করা সত্ত্বেও যন্ত্রে ভোট দেওয়াকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করা যায়নি। তাই এটি খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। এখানে কেবল যন্ত্রের ব্যবহার রাখলে চলবে না। কাগজের ব্যবহার থাকতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যন্ত্রে আগে থেকে কারসাজি করার কোনো সুযোগ নেই। একটি ভোটের জন্য একবারই প্রোগ্রামিং (ওটিপি) করা হয়। ভোট শুরুর আগে কোনো যন্ত্রে কারসাজি করা হলে সেটা তো আর কাজই করবে না। একেকটি যন্ত্র তৈরিতে তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল সম্ভবত ২৪ হাজার টাকা, যা দিয়ে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যেত। ফলে ব্যালট ছাপানো, কালি, কলম, ব্যালট বাক্স কেনার খরচ বাঁচত। সময় তো বাঁচতই। তিনি বলেন, যন্ত্রে কাগজের ব্যবহার রাখা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে ভিভিপিএটি বা ভোটার ভেরিফিকেশন পেপার অডিট ট্রেইল বলা হয়। এতে অভিযোগ উঠলে মেশিন থেকে ভোটের তথ্য নেওয়া যাবে।
শামসুল হুদা কমিশন ইভিএমে ভোট নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। সে সময় এ কাজে বুয়েট ও বাংলাদেশ মেশিন ট্যুলস ফ্যাক্টরিকে সম্পৃক্ত করা হয়। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে প্রথমবারের মতো ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ওই কমিশন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৯টি ওয়ার্ডে ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব ওয়ার্ডে ইভিএম ব্যবহার করে। মূলত ভোট গণনার সময় কমিয়ে আনতে, ব্যালট ছাপানোর ঝামেলা কমাতে এবং ভোট কারচুপি বন্ধ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সদ্য বিদায়ী রকিব কমিশন কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করে। ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় সেখানকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেখানে কিছু অভিযোগ উঠলেও ভোট পুনরায় গণনার কোনো সুযোগ ছিল না। তারপর থেকে কমিশন ইভিএম ব্যবহারে পিছু হটে। ওই সময় নির্বাচন কমিশন ও বুয়েটের মধ্যে এই মেশিন নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। এ কারণেও ইভিএমের কাজ স্থগিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় গত বছরের জুলাইয়ে ইসি নিজেদের আইসিটি শাখার লোকবল দিয়ে ইভিএমের নতুন প্রটোটাইপ (নমুনা) নিয়ে আসে।
গত মঙ্গলবার বিদায় নেওয়া নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, ডিভিএমে ভোট নেওয়ার বিষয়টি এখন কারিগরি কমিটির মতামতের অপেক্ষায় আছে। তাঁরা কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছেন। এই মেশিন নিয়ে যাতে কোনো বিতর্কের সুযোগ না থাকে, সে জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা কমিটি দেখবে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।
জানতে চাইলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের চিন্তা চলছে। এ জন্য ইতিমধ্যে একটি শক্তিশালী কমিটিও করা হয়েছে। তাঁর মতে, ডিভিএম এমন একটি যন্ত্র, সেখানে কারচুপির কোনো সুযোগ থাকবে না। ভোটের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত হবে। ভোটারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যগুলো সংরক্ষিত থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত ডিভিএম চালু হবে কি না, তা নির্ভর করছে কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর।


শেয়ার করুন


একই রকম আরও কিছু পোস্ট