উন্নয়ন সাংবাদিকতার কারিগর

91348_f5সিটিএন ডেস্ক :

কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের আজ (৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৫) ৬২তম জন্মদিন। তিনি ১৯৫৪ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন চাঁদপুরে। (সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার জন্মতারিখ ২৮শে জুন ১৯৫৬)। শাইখ সিরাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ভূগোলে। ছাত্রজীবনেই সম্পৃক্ত হন গণমাধ্যমের বিভিন্ন শাখার সঙ্গে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী গণমাধ্যমে কৃষি উন্নয়নকর্মী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। ১৯৯৫ সালে ৩৯ বছর বয়সে উন্নয়ন সাংবাদিকতায় পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক। টেলিভিশনের সঙ্গে প্রায় তিন যুগের একনিষ্ঠ পথচলার মধ্য দিয়ে শাইখ সিরাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন উন্নয়ন সাংবাদিকতার এক অগ্রপথিক হিসেবে। গণমাধ্যমে যার উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণায় আমূল পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশের কৃষিতে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সূচিত হয়েছে বৈপ্লবিক সাফল্য। গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। দেশের অর্থনীতিতে কৃষির বহুমুখী অবদান সূচিত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বহু সাফল্যের দৃষ্টান্ত। যার পেছনে যত কল্যাণমুখী তৎপরতা ও কর্মযজ্ঞ রয়েছে তার অন্যতম একটি হচ্ছে শাইখ সিরাজের কৃষিভিত্তিক বহুমুখী গণমাধ্যম কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্রের অশোকা ফেলো শাইখ সিরাজ খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে সাংবাদিকতায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৯ সালে অর্জন করেছেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এ এইচ বুর্মা অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া তিনি পেয়েছেন বৃটেনের বিসিএ গোল্ডেন জুবিলি অনার অ্যাওয়ার্ডস। ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্স তাকে প্রদান করেছে বিশেষ সম্মাননা, বৃটিশ বাংলাদেশ ব্যবসায়ী সংগঠন তাকে দিয়েছে গ্রিন অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া পেয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির স্বর্ণপদক, ডা. ইব্রাহিম মেমোরিয়াল স্বর্ণপদকসহ অর্ধশত দেশী বিদেশী পুরস্কার ও সম্মাননা। শাইখ সিরাজ টেলিভিশনের মতো শক্তিশালী গণমাধ্যমের শহর নগরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে বিশাল পরিধিতে নিয়ে গেছেন। তার একের পর এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মধ্য দিয়ে টেলিভিশন আজ শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই। টেলিভিশন পরিণত হয়েছে গ্রামীণ জনজীবন, অর্থনীতি তথা সমাজ বদলের অন্যতম এক শক্তি ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের খোরাকে। শাইখ সিরাজ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কৃষি উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসবে বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। কৃষকের ঈদ আনন্দ, কৃষকের বিশ্বকাপ ফুটবল, কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট-এর পাশাপাশি কৃষকের চিকিৎসাসেবা, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য ‘ফিরে চলো মাটির টানে’র মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। কৃষিকে তিনি নিয়ে গেছেন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে। এবারের ঈদ উপলক্ষে তিনি উগান্ডার কৃষকদের নিয়ে ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ নির্মাণ করেছেন। তিনি কৃষকের কৃষি উন্নয়ন ও কৃষকদের উৎসাহের জন্য ‘কৃষি পদক’ও প্রণয়ন করেছেন। ময়মনসিংহ শম্ভুগঞ্জের মাছ চাষি ও হ্যাচারি উদ্যোক্তা নূরুল হক শাইখ সিরাজের জন্মদিন উপলক্ষে একটি লেখায় লিখেছেন, আশির দশকের কথা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি অনুষ্ঠান ‘মাটি ও মানুষ’। সম্ভবত শনিবার রাত আটটার বাংলা সংবাদের পর প্রচারিত এ অনুষ্ঠানটি দেখে অনেকেই কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজ। এ অনুষ্ঠানটিতে দেখানো হয় কিভাবে একজন হাকিম আলী মাছ চাষ করে তার সংসারে সচ্ছলতা আনেন। এছাড়াও হাঁস, মুরগি, গবাদিপশু ইত্যাদি লালন পালন করে কিভাবে সহজেই একজন মানুষ তার আর্থিক সচ্ছলতা আসে তাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখানো হতো। আর এই অনুষ্ঠানগুলো দেখে এগুলো চাষাবাদের স্বপ্ন বা আশা তৈরি হয়েছিল। সেই সকল স্বপ্ন বা ধারণা বা আশা থেকেই কিছু শিক্ষিত মানুষ এসব কাজে জড়িয়ে পড়ে মনের অজান্তে। অনেকটা শখে, অনেকটা আবেগে, স্বপ্ন কল্পনা করতে করতে অনেকেই জড়িয়ে পড়েন কৃষি কাজে। কৃষি, শুধু যে লুঙ্গি গামছা পরা হাড় জির জিরে একজন মানুষ নয় বরং বর্তমান সময়ে কৃষি বা কৃষক বলতে একজন সৃজনশীল মানুষের, তার সৃজশীলতার আত্মপ্রকাশের মঞ্চ হিসেবেই আভির্ভূত হওয়ার নামই হয়েছে কৃষি বা কৃষক। বর্তমার সময়ে এসে কৃষকের যে নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতা আছে তা প্রমাণ হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বা কৃষির বিভিন্ন ডালপালায়। আর এই সবকিছুই যার জন্য সম্ভব হয়েছে তিনি বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা কৃষকবন্ধু শাইখ সিরাজ।
আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে এসব দেখানো হতো। অনেকেই এটাকে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের মতো উপভোগ করত, বিশেষ করে শহরের মানুষ। কিন্তু আমাদের মতো কিছু মানুষ এ অনুষ্ঠানটিকে স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে ধরে নিয়ে এই পেশায় আত্মনিয়োগ করে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। মাছ চাষ করে খাবার খাইয়ে বড় করে বাজারে বিক্রি করে লাভ হবে- এ ধারণাটাকে আমরা শিল্পতে রূপান্তরিত করতে পেরেছি। আর এটার পিছনে গণমাধ্যম, বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই সময়কার অনুষ্ঠান ‘মাটি ও মানুষ’ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেই বিটিভির মাটি ও মানুষ, পরবর্তীতে চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’, বিটিভিতে ‘কৃষি দিবানিশি’ জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোর স্বপ্নদ্রষ্টা শাইখ সিরাজকে তার জন্মদিনে আমাদের মতো খামারিদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমরা তার সুস্বাস্থ্য, কর্মক্ষম দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
শাইখ সিরাজ চ্যানেল আই, বাংলাদেশ টেলিভিশনে কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন। তিনি এদেশে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে নিরস বিষয় হিসেবে উপেক্ষিত কৃষিতে জাতীয় সংবাদের প্রধান খবরের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যা দেশের অন্যসব টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় অনুসৃত হচ্ছে। শাইখ সিরাজের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, মৎস্য ম্যানুয়েল, মাটি ও মানুষের চাষবাস, ফার্মার্স ফাইল, মাটির কাছে মানুষের কাছে, বাংলাদেশের কৃষি : প্রেক্ষাপট ২০০৮, কৃষি ও গণমাধ্যম, কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট (সম্পাদিত), আমার স্বপ্নের কৃষি, কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট (২০১১), সমকালীন কৃষি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০১১), কৃষি ও উন্নয়নচিন্তা (২০১৩) ইত্যাদি।


শেয়ার করুন


একই রকম আরও কিছু পোস্ট